Md.Nezam Uddin - (Chattogram)
প্রকাশ ১৭/০৩/২০২২ ১২:০৮পি এম

খোকা থেকে  বঙ্গবন্ধু তারুণ্যের অনুপ্রেরণা

খোকা থেকে  বঙ্গবন্ধু তারুণ্যের অনুপ্রেরণা
ad image
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই আমাদের বাঙালি জাতির পিতা। বাংলার অবিসাংবাদিত নেতা আজীবন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন, সার্বভৌম সোনার বাংলাদেশ।

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ  ছোট্ট খোকাটি ঢাকার গোপালগন্জ নামক টঙ্গীপাড়া গ্রামে এক সম্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান আর জননী মা সায়রা খাতুন।  চার কন্যা ও দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। ছোটবেলায় তাকে আদর করে " খোকা"নামে ডাকা হতো।

টুঙ্গিপাড়ার শামল পরিবেশে বঙ্গবন্ধুর শৈশব কাটে দুরন্তপনায়। শৈশবকাল থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল বঙ্গবন্ধুর অধীর আগ্রহ ছিল। মধুমতী  নদীর ঘোলা জলে গ্রামের ছেলেদের সাথে সাঁতার কাটা, দল বেঁধে হা ডু ডু, ফুটবল আর ভলিবল খেলায় তিনি ছিলেন বালকদের নেতা। এলাকার ছেলেরা তাঁকে ডাকত 'মিয়া ভাই' বলে।

শেখ বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে শেখ মুজিব গোপালগণ্ঞ্জ মিশন স্কুলে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি মেট্রিকুলেশন  পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।১৯৪৭ সালে শেখ মুজিব কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে বিট্রিশ বিদায়ের পর তিনি ঢাকা চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও তাঁর রাজনৈতিক সহচর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একবার বঙ্গবন্ধুর স্কুল পরিদর্শনে আসেন। তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র।  স্কুলের ছাত্রবাসটি ছিল  জরাজীর্ণ। ছাদ চুয়ে পানি পড়তো। স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকবার আবেদন করেও অর্থভাবের কারণে কোন প্রতিকার মেলেনি। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ছাত্রবাসটি সংস্কারের জোরালো দাবি জানায়। কিশোর শেখ মুজিবের অদম্য সাহস দেখে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বিস্মিত হন এবং ছাত্রবাসটি সংস্কারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করেন।

ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতিতে হাতেখড়ি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপোষহীন।  অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি প্রথমে জেলে যান। তারপর থেকে এ বাংলার মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে তিনি পঞ্চান্ন বছরের ছোট্ট জীবনে ১৮ বারে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাবরণ করেন।  তারপরও তিনি শাসকগোষ্ঠীর কাছে কোনদিন মাথানত করেননি। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় তিনি মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের নেতা হিসাবে  বিশেষ অবদান রাখেন।  তিনি বাংলার গৌরব ও গর্ব নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসু, শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক,  হোসেন সোহরাওয়ার্দী , মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রমুখের সাহচর্যে এসেছিলেন।

খোকার জীবন ছিল সংগ্রামী জীবন। কিশোর খোকা যখন যুবকে পরিণত সেই সময় তদানীন্তন আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করেন। এ সময়ে মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। দেশের আপামর জনসাধারণের ন্যায্য দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি কখনো আপোষ করেননি। যুবক বয়সে তিননি একবার মন্ত্রী হয়েছিলেন, কিন্তু দলকে শক্তিশালী করার জন্য  তিনি মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি যখন আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলেন তখন জাতীর মুক্তি ও স্বায়ত্বশাসনের জন্য ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

পাকিস্তানের সামরিক ডিক্টেটর বাঙালি গণতান্ত্রিক  চেতনাকে নস্যাৎ  ও বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবির আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে বাঙালির  প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়ের করে। এ মামলাই ইতিহাসের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে অভিহিত।  ১৯৬৯  সালে জানুয়ারি মাসে পূর্ব বাংলায় গণঅভ্যুত্থান ঘটলে ষড়যন্ত্রকারীরা শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জাতীয় পরিষদেন ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসনে বিজয়ী হয়ে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পশ্চিমা কর্তৃপক্ষ আওয়ামীলীগকে সরকার গঠন করতে না দিয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে। এ পরিস্থিতিতেও  পাকিস্তানী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে ডেকেও অপ্রত্যাশিতভাবে ১লা মার্চ তা অনিদিষ্টকালের জন্য মূলতবি ঘোষণা করেন। এ খবর শুনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ডাক দেন।

এ জনসভায় একমাত্র বত্তা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষণে তিনি চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া, গণহত্যার তদণ্ড ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর এ ভাষণ ছিল জাতির জন্য মুক্তিসংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা।  বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে বাঙালি যখন শত্রুর বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে ঠিক তখনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের শুরু হয় নৃশংস হত্যাকান্ড। 

শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের আগে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার একটি ঘোষণাপত্র চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগ নেতা হান্নান চৌধুরীর কাছে পাঠান। এ ঘোষণাপত্রই হান্নান চৌধুরী ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে পাঠ করেন
বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ, সমমনা রাজনৈতিক দল ও দেশের আপামার জনগণের সহযোগিতায় গড়ে উঠে মুক্তিবাহিনী, গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত ও ২  লক্ষ মা-বোনদের সম্ভ্রামের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ ই জানুয়ারি  স্বদেশ প্রত্যাবর্তন  করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত  বাংলাদেশের হাল ধরেন শক্ত হাতে। শেখ মুজিবুর  রহমান বাঙালি জাতির জনক হিসাবে বাংলাদেশে ও বিশ্বে লাভ করেন ব্যাপত পরিচিতি যা একজন তরুণকে সামনে এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় যোগায়।

সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে অনেক কিছু অভাবব ছিল। বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। স্বল্প সময়ের মধ্যে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নবীন রাষ্ট্রটিকে স্বাধীন- সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে পরিপূর্ণতা দান করতে সক্ষম হন। তিনি যখন দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণতা  করে উন্নতির পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন সে সময় স্বার্থন্বেষী কিছু কুচক্রিমহল তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ  করতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারের নির্মমভাবে হত্যা করে। জাতির পিতা হত্যার পর পুরো জাতি শোক স্তব্ধ ও নিষ্প্রাণ  হয়ে পড়ে। রুদ্ধ হয়র পড়ে বাংলার উন্নয়নের অগ্রযাত্রা। পঁচাত্তর পরবর্তীতে প্রায়ই একুশ বছর এই স্তবদ্ধতা বিরাজমান থাকে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের জাতির পুকার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ জানিবার সুযোগ্য নেতৃত্বে জাতি আবার ফিরে পায় তার পুরানো গতি। বাংলাদেশ আবার জাতির পুকার স্বপ্ন পূরণের উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলে।

শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ভাগ্যাহত বাঙালি জাতির মুক্তির অকুতোভয় অগ্রদূত।১৯২০ সালে জন্ম নেয়া সেই খোকা আজ বাঙালি জাতির হৃদয় জুড়ে আছে। ২০২২ সালে আজ সেই খোকার ১০১ তম জন্মবার্ষিকীর শতবর্ষ ছড়িয়ে গেলেও  কর্মস্পৃহা, সংগ্রামী জীবনে অংশ তারুণ্যের অনুপ্রেরণা হিসাবে আছে।

তাঁর বলিষ্ঠ ও সাহসী নেতৃত্বের জন্য তিনি সকল বাঙালির হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ব্যক্তি মুজিবের মৃত্যু হলে ও মুজিবার্দশের মৃত্যু নেই। তাই কবি কণ্ঠে ধ্বনিত হয়-'যতদিন রবে পদ্না, মেঘনা,যমুনা, গৌরি বহমান ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান'
২০২২ সাল ১৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী। 

২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ৫২ তম দিবস হিসাবে পালিত হবে। এখনো সারা বিশ্বের অনেকগুলো রাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে।  বিশেষ করে ফিলিস্থান, কাশ্মীর, চেচনিয়া-বসনিয়া,  মিন্দানা, মান্নাদ্বীপ সহ অনেক নিপড়ীত অঞ্চল।   স্বাধীনতার সংগ্রাম নেতৃত্ব ও আনন্দোলন করতে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় মহানায়ক হিসাবে স্মরণীয় ও বরণীয়  হয়ে আছেন আমাদের অবিসাংবাদিত  নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ,ঘানার কাওমী নক্রমা, ইতালির গ্যারিবল্ডি, কেনিয়ার জুমো কেনিয়াটা, রিপাবলিক অব কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বো, জাম্বিয়ার কেনেথ কাউড্রা, জিম্বাবুয়ের রর্বাট মুগাবে, জার্মানির বিসমার্ক , পূর্ব তিমির জানানা গুসমাও, ফ্রান্সের চার্ল দ্য গল সহ স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য অবিসংবাদিত নেতা হয়ে বিশ্বের বুকে স্থান করে আছে। তাই একুশ শতকের চ্যালেণ্ঞ্জ মোকাবেলায় বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারুণ্যের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তরে।


লেখক: নেজাম উদ্দিন
শিক্ষার্থী - (চারুকলা বিভাগ) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ