Md. Ashraful Alam
প্রকাশ ২৩/০২/২০২২ ০৩:১৯পি এম

অসম ভালবাসায় কালো মেঘ (গল্প পর্ব-৩)

অসম ভালবাসায় কালো মেঘ  (গল্প পর্ব-৩)
ad image
মাহিন- আপনি তবু কাজ করছেন আমারতো কোন কিছুতেই মন বসছে না। বিন্দু উৎকন্ঠার সাথে বল্লো- কোন সমস্যা জনাব ? মাহিন -না কোন সমস্যা নয়। শুধু আপনার কথা মনে পড়ছে। আর আপনার পাশে বসে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কথা না বাড়িয়ে বিন্দুও বলে দিলেন- আমারও তো আপনার সাথে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কি যে হচ্ছে এসব বুঝছি না।

এই কথা শুনে মাহিনের মনের মধ্যে আনন্দেও মাত্রা যেন শতভাগ বেড়ে গেল। কারণ মাহিনের মনের কথার সাথে বিন্দুর মনের কথার একটা অন্যরকম মিল খুজে পাওয়া গেল। তার মানে হলো বিন্দুর মনেও মাহিনের জন্য ভালবাসার অংকুর রচিত হয়েছে। দুজনার অজানতেই দুজনকে ভালবাসার পাহাড়ের চুড়ায় নিয়ে গেছে নিজেদেরকে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার কথা হয় দুজনার।

মনের অনেক অজানা কথা বলায় দুজনের মনের প্রেম তখন তুঙ্গে। এভাবে দিনের পর দিন যেতে থাকে। অফিসের কাজের ফাঁকে ভালবাসার পরশ দিয়ে নানা ধরনের খাবার নিজ হাতে বানিয়ে নিয়ে কখনো একা গোপনে আবার কখনো অন্য সহকর্মীদের সামনে সকলের সাথে খাওয়াতে ভাল লাগে বিন্দুর। মাহিন ও যেন বিন্দুর হাতের খাবার খেতে বেশ আনন্দ ভোগ করতে থাকে। বিন্দু চাকুরীর বেতন পেয়ে মাহিনের জন্য প্যান্ট শার্ট কিনে উপহার দেয়। বিনিময়ে মাহিনের কাছ থেকে কোন কিছু নিতে কোন দিন রাজী ছিলেন না বিন্দু। বাহিরে কারো গায়ে কোন কাপড় দেখতে ভাল লাগলে ঠিক সেই কাপড়টা মাহিনের জন্য কিনতেন আর মাঝে মাঝে সারপ্রাইজ দিয়ে বেশ আনন্দ উপভোগ করে মজা নিতেন বিন্দু। দুজনার ভালোবাসার গভীরতা অনেক দুর গড়িয়ে যায়। পারস্পারিক আস্থা আর বিশ^াস যেন মজবুত আকার ধারণ করতে থাকে দুজানার মধ্যে।

এর বহিপ্রকাশ যেন কোন কোন সময় স্মৃতির পাতায় সাক্ষী হয়ে রয়ে যায়। একদিন অফিস শেষে বিন্দু আগেই বাসায় চলে যায়। তখন মাহিন গবেষনার কাজে মাঠে থাকায় ফিরতে দেরি হয়। সেইদিন বেশ সকাল সকাল অফিস থেকে ফিরে মাহিনকে বার বার মনে পরছিলো বিন্দুর। মাহিন বেশ ব্যস্ত থাকায় আর ফোন করতেও ভূলে গেছে। অফিসে ফিরে ঘড়ির দিক তাকিয়ে দেখে ৫টা বাজে। ততক্ষণ বিন্দু বাসায় চলে গেছে। একটা ফোন দিতেই মাহিন ওপার থেকে বলতে থাকে বিন্দু।

“ দেখো মাহিন আজ আমার কিছু ভালো লাগছে না। বাসায় কেউ নেই। তুমি কি কিছু সময়ের জন্য আসতে পারবা?’’ মাহিন- আমি তো সবেমাত্র অফিসে আসলাম। কাজ গুলো দ্রুত শেষ করে দেখি পারি কি না। তুমি অপেক্ষা করো দেখি। বিন্দু- না তুমি আজ আর কোন কাজ করবে না। আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য। আজ আমি তোমাকে ভালো করে কাছে বসে দেখবো মাহিন। প্লিজ না করো না।

মাহিন- আচ্ছা বাবা এখন ফোন টা রাখো। দেখছি কত তাড়াতাড়ি গুছাতে পারি। মাহিন অফিসের কাজ দ্রুত গুছিয়ে রওনা দিলো। সন্ধা হওয়ায় তেমন কোন যানবাহন না পেয়ে পায়ে হেটেই রওনা দিলো। ঠিক বাসার কাছা কাছি এসে আবারও ভাবতে লাগলো, বিন্দু বাসায় একা, কেউ নেই এভাবে যাওয়টা ঠিক হবে কি না। আবার মনটাও চাইয়ে। ওদিকে আবার বিন্দুও আশা নিয়ে বসে আছে। অনেক ভাবনার পর মাহিন ফোন করে বিন্দুকে। বলে ভাবছি আমি দুটো পথের মাঝে দাঁড়িয়ে এখন বা দিকে গেলে বিন্দুর কাছে যাবো আর ডান দিকে গেলে বন্ধুদের কাছে যাবো। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। বিন্দু ওপার থেকে বলে আজ তুমি বন্ধুদের সাথে পরে আড্ডা দিবা। আমি তোমার জন্য খাবার বানিয়ে বসে আছি।

মাহিন আর কিছু না ভেবে বিন্দুর বাসার দিকে রওনা দিলো। অনেক দিনের পরিচয় হলেও সেই দিনই প্রথম বিন্দুর বাসায় যায় মাহিন। বিন্দু জানালায় দাঁড়িয়ে থাকায় বাসা চিনতে দেরি হলো না। বাসার সামনে যেতেই বিন্দু দরজা খুলে দিতেই মাহিন ঘরে প্রবেশ করে। বাসায় কেউ নেই। শুধু দুজনে। প্রায় ৪ মাস দুজনের সম্পর্ক কেউ কোন দিন কাউকে ছুতেও পারে নি। তাই আজ একে অপরকে কাছে টানার ইচ্ছা প্রবল। বিন্দু বয়সে বড় হলেও কোন সংকোচ না করে জরিয়ে ধরার লোভটা যেন সামলাতে পারলো না। তাই দুই হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো বিন্দু। মাহিনও কোন উত্তর না করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নির্বাক হয়ে রইলো। কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার পর বিন্দু ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো আর বলতে লাগলো।

“ মাহিন আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তোমাকে কাছে পেতে আমার পথে অনেক বাঁধা। তাই আমার ভয় হয়। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না মাহিন। আমার অনেক কষ্ট অনেক যন্ত্রনা। আমাকে একটুখানি সুখের নিবাসে রাখতে পারবা তুমি। মাহিন বুঝতে পারছিলো না এই কথার উত্তর কি হতে পারে। শুধু বলতে থাকে “একটু শান্ত হও বিন্দু, ধৈর্য্য ধরো আমায় বলো কি হয়েছে তোমার, আমি তো তোমার পাশে আছি, আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি বিন্দু, আমাদের দুজনের মধ্যে কারো অবিশ^াসের আর কোন জায়গা নেই বিন্দু”। এই বলে দুজনের চোখের দিকে তাঁকিয়ে একে অপররের ঠোট দুটো কখন যে এক হয়ে গেলো কেউ বুঝতে পারলো না। পরম আদরে একে অপরকে আলিঙ্গন করতে থাকে। এক পর্যায়ে চরম আনন্দ অনুভবের টানে কখন যে প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নির্জন একাকি ঘরে গভীর অন্তরঙ্গ সম্পর্কে মিশে গেলো দুজনে কেউ যেন কোন আপত্তির সম্মুখীন হলেন না। স্থিরতা কে হার মানিয়ে কিছু সময় আনন্দে ভাসলো দুজনে। সেদিন যেন আবারও শক্ত একটা বাঁধন সৃষ্ঠি হলো দুজনের মনে। একে অপরের প্রতি দায়িত্বটা আরও মজবুত করার অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো দুজনে।

একটু পরে দুজনে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। একে অপরের দিকে তাঁকিয়ে হাসতে থাকলো। এবার ফ্রেশ হয়ে নাস্তা এবং চা খেতে খেতে গল্প। মাহিন- দেখো বিন্দু এমনটা হওয়া ঠিক হলো না। এত অল্প সময়ের পরিচিত হয়ে এত তাড়াতাড়ি এমন কিছু যেন মনকে স্বায় দিতে পারছি না। নিজেকে অপরাধী লাগছে। এটা আমরা কি করলাম।

বিন্দুÑ দেখো কপালে যা লেখা ছিলো তাই হয়েছে। উপর আলার ইশারা ছাড়া কিছুই হয় না। উনি সব জানেন। যা হবার তাই হয়েছে। এখন বাদ দাও তো সব। মাহিন- মনে একটা খটকা লাগছে কোন ভূল করলাম না তো। বিন্দু- মাহিন এখন তুমি যাও। পরে ফোনে কথা হবে। আমার বাসায় লোকজন চলে আসবে। ওদের সময় হয়ে গেছে আসার। আর যা হয়েছে এটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে তুমি একদম কোন টেনশন করবা না। আমাকে নিয়ে কোন ভয় নেই তোমার। আমি সে রকম মেয়ে নই। আমি জীবনেও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবো না। লক্ষীটি এবার যাও। স্যারি যে এমন করে বলতে হচ্ছে তোমায়। মাহিন- না ঠিক আছে আমি তাহলে আসি। বাহিরে গিয়ে তোমায় ফোন করব। তুমি ফ্রি হলে আমায় এসএমএস দিও।

মাহিন বিন্দুর বাসা থেকে বেরিয়ে আসার পর ভাবতে লাগলো। বিন্দু আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। এমন একটা কান্ড কি করে ঘটাতে পারলো। তবে কি যৌবনের বাস্তবতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়ে এমন ঘটনার জম্ম হলো আজ। অনেক বিরুপ ভাবনায় মাহিনের মনে বিষাদের ছায়া পরতে লাগলো। সারারাত যেন দইু চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। ওদিকে বিন্দুর অবস্থাও তাই। মাঝে মাঝে মোবাইলের এসএমএস এ কথা হচ্ছে। দুই জনেই নিজেকে অপরাধী বলে দুই জনের কাছে আত্বসমর্পন করতে থাকে। তারপরও যেন দুজনের কাছে আসার গল্পটা আরও বেশি রোমান্টিক হয়ে ওঠে। যতই ভাবতে লাগে ততই বিন্দুর প্রতি তাঁর ভালবাসা আরও বেশি গভীর হতে থাকে। এখন বিন্দুর জন্যও কিছু কিনতে পছন্দ করে দিতে ভাল লাগতে শুরু করেছে মাহিনের মনে। তাই বিন্দু কি খেতে ভালবাসে তা নিয়ে আসতে সম্মতি চায় বিন্দুর কাছে।

মাহিন এবং বিন্দুর অফিস সময় ছিলো প্রায় একই সময়। তাই প্রতিদিন সকালে মাহিন ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে। রাস্তার মোড়ে চা খেতে খেতে বিন্দুর অপেক্ষা করতে থাকে। সকালে বিন্দুর মুখখানা না দেখলে যেন সারাদিনে অফিসে কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বিন্দুও মনে মনে প্রত্যাশা করতো মাহিনকে দেখার। তাই দুর থেকে অটো রিক্সার ঠিন ডান পাশে বসতো কারণ ডানদিকে ছিলো মাহিনের দাড়িয়ে থাকা চায়ের দোকান। সুযোগ হলে লোকজনের চোখের আড়ালে চোখের ভাষার পাশাপাশি বিভিন্ন ইঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাতো দুজনেই।

একদিন বিন্দু মাহিনকে তার বাসায় থাকার অফার করে। অর্থাৎ বিন্দুর বাসার সকলেই ঢাকায় যাবে। সেই সুযোগে মাহিনকে সাথে নিয়ে একটি রাত ঘুমানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মাহিনের কাছে। মাহিন প্রথমে অস্বীকৃতি জানালেও বিন্দুর অনুরোধের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। সেদিন ছিলো বিশ^কাপ ক্রিকেটের ফাইনাল খেলা। মাহিন পরিবারের কাছে মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে বিন্দুর বাসায় থেকে যায়। খেলা দেখতে দেখতে আর গল্প করতে করতে কখন যে ভোর হয়ে যায় কেউ বুঝতে পারে না। এমন সময় ঘরির এলার্ম বাজায় দুজনেই কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে পরে। ঘুমের ঘোরে কোন একসময় অন্তরঙ্গ আলিঙ্গনে আবারও এক হয়ে যায় দুজনে। এবার আর কোন অপরাধ বোধ কাজ করছিল না। কারণ দুজনের চাহিদা সমান হয়ে ওঠে দুজনার কাছে আর তাই-----। (চলবে)

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ