Motior Rahman Sumon - (Mymensingh)
প্রকাশ ২১/০২/২০২২ ১২:৫৪পি এম

জীবনের সাত রঙে তুমি নেই(জীবনস্মৃতি পর্ব-২৯): লেখক মতিউর রহমান সুমন

জীবনের সাত রঙে তুমি নেই(জীবনস্মৃতি পর্ব-২৯): লেখক মতিউর রহমান সুমন
ad image
বছরের প্রথম দিন পত্রিকার প্রথম পাতা (ফ্রন্ট পেইজ) এ আত্মহত্যার পরিসংখ্যান। এক বছরে ১০১ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা।
কী ভয়ানক তথ্য!
এর প্রেক্ষিতে টেবিলে খেতে বসে ৫ মিনিটেই লিখে ফেলি নিচের এই লেখাটুকু।

বেঁচে থাকার হাজারটা কারণ পাওয়া যাবে, মৃত্যুর কারণ থাকে মাত্র একটা তবু মানুষ আত্মহত্যা করে।
একটা কারণ পাহাড় সমান বড় হয়ে উঠে চোখের সামনে। বেঁচে থাকার হাজারটা কারণও তখন চোখে পড়ে না, তুচ্ছ লাগে সবকিছু।
ঠিক সেই মুহূর্তে কারো সাথে কথাগুলো শেয়ার করলে বেঁচে থাকার কারণগুলো মনে করিয়ে দিত, এমন কিছু মানুষ রাখুন, থাকুন প্রয়োজনে যার সাথে সব কিছু বলা যায়।
প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানে এমন একটা ছোট কেন্দ্র/কাউন্সিলিং কক্ষ থাকা দরকার যেখানে মানুষ অসময় গুলোতে মনখোলে কথা বলতে পারবে। টাকা দিয়ে নয় কথা দিয়ে কেউ তাকে সাহায্য করবে।
মানুষ মরে না, সমাজ তাকে মেরে ফেলে।
মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কেউ সহানুভূতির হাতটি বাড়ায় না,
চারপাশটা যখন একাকীত্বে ছেয়ে যায়,
হতাশা ক্লান্তিগুলো বুকের ভিতর পাহাড় সমান হয়ে উঠে তখনই না কেবল মানুষ দুঃসাহসিক হয়ে উঠে, সেই সাহসিকতাটা বেঁচে থেকে অন্য কাজে লাগালে সেই হত অন্যতম সফল ব্যক্তি, কিন্তু আফসোস কাজে লাগে আত্মহত্যায়।
দোষ আত্মাহত্যাকারী নিজেরই কেন সে তার চারপাশে এমন একটা মানুষ সৃষ্টি করতে পারলো না যাকে সব কিছু মনখোলে বলা যায়, যার কথা মনে করেও আত্মহত্যার মত ঘৃণিত কাজ থেকে ফিরে আসা যায়।
মনে কথা চেপে রাখতে নেই।
কাউকে ভালোবাসেন বলে দিন-না ভাই,
যা হবার হবে, প্রত্যাখ্যানের চেয়ে বেশি কিছু তো হবে না। তবু মনের চাপা যন্ত্রণা থেকে বেঁচে তো গেলেন। তার জন্যে নিজেকে যোগ্য করে তুলুন না!
হঠাৎ জানলেন আপনার প্রতিক্ষিত প্রিয়তমার বিয়ে, রাতে এক গাদা ঘুমের বড়ি খেয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে গেলেন কী লাভ হল তাতে?
ঐ মেয়েটাও তো জানতোনা আপনি তাকে এতো ভালোবাসতেন, তাহলে দোষটা কার?
আসুন আত্মহত্যার একটা কারণ ভুলে গিয়ে বেঁচে থাকার হাজারটা কারণকে আঁকড়ে ধড়ি।
আপনার মৃত্যুতে কারো কিচ্ছু আসে যায় না।
কষ্টটা কেবল আপনার বাবা-মায়ের।
কাছের কজনের, সেটাও কদিন?
পৃথিবী চলছে-চলবে সে কী আপনার জন্যে থেমে যাবে?
প্রিয়তমা আরেকজনের খাট কাপাচ্ছে আর আপনি বরফের মত জমে গেলেন, নেশার চাদর গায়ে মাখলেন, কেন ভাই? এতে লাভ/ক্ষতি কার হল, ভেবেছেন কি কখনো?
পেছনটা ভোলে যান, সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ভোলে, নতুন উদ্যমে শুরু করুন। সামনে এগিয়ে চলুন। দেখুন পৃথিবীটা আপনার জন্যে নূতনরূপে সেজেছে।
বেশি হতাশা, মন খারাপ কিংবা কোন কিছুই ভালো না লাগা উদয় হলে ছোট খাটো ভ্রমণে চলে যান।
আপনাকে অভিনন্দন দেওয়ার জন্যে অপেক্ষায় আছে অসংখ্য মানুষ।
ঘুরে দাঁড়ানোর আজই সময়।

এখানে আমি উদাহরণ হিসেবে আত্মহত্যার একটা কারণ প্রেমঘটিত দেখিয়েছি। যা কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি ঘটে। বাস্তবিক অর্থে একাকীত্ব, হতাশা আত্মহত্যার প্রধান কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী গত বছর আত্মহত্যা করেছিলো চাকরী না পাওয়ার হতাশায়। চাকরীর বয়স শেষ। সর্বশেষ যে পরীক্ষাটি দিয়েছিল তার ফলাফল বের হয়েছিলো ছেলেটির আত্মহত্যা করার পর। হতাশার সীমা অতিক্রম করে, এক বুক জ্বালা নিয়ে ঘুমিয়ে যায় চিরতরে। মৃত্যুর পর সর্বশেষ পরীক্ষাটির ফলাফল বের হয় আর জানা যায় জীবনের শেষ চাকরী পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলো সে। কিন্তু হায় ততক্ষণ পর্যন্ত ছেলেটি আর বেঁচে নেই।
সেজন্যে ভাই জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আশায় বেঁচে থাকুন। ধরে নিলাম আশাটা পূরণ নাও হতে পারে কিন্তু এই আশাটায় আপনার বেঁচে থাকার একটা কারণ তো হতে পারে।

একই কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলে আত্মহত্যা করে করোনা অতিমারির সময়ে।
বয়স্কদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রধান কারণ একাকীত্ব!
'গর্ভধারিণী' নামে একটি নাটক আছে যেখানে মায়ের চরিত্রে শর্মিলী চৌধুরী অভিনয় করেছেন। একাকীত্বের কারণে নিজের ছেলে-মেয়েদের ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যান তিনি। ছেলেদের ভালোবাসার কমতি ছিল না। কিন্তু সারাদিন ছেলেরা থাকে অফিসে, বউমা থাকে নিজের সন্তান নিয়ে স্কুলে। মা সারাদিন বাসায় একা। কথা বলার লোক নেই। কোন কাজ নেই। বয়সের ভাড়ে কোন কাজও লাগেন না তিনি, বসে থাকায় কাজ! এক সময় একাকীত্ব চোখে পানি ঝড়ায়। ছেলে-মেয়েদের কোন অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাতসারে তারাই অপরাধী!
যদিও ইহা একটি নাটক বাস্তবিক জীবনে তাহাই ঘটছে। আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

এই পর্যন্ত লেখার এক মাস পর আজ আবার যখন লিখতে মোবাইল প্যাডটা ওপেন করলাম তখনও একটি আত্মহত্যার ঘটনা ফেইসবুকের পাতায় পাতায় ছেয়ে গেছে। গত ২/২/২২ইং তারিখে চিত্র নায়ক রিয়াজের শ্বশুর লাইভে এসে নিজের একাকীত্বের কিছু কথা বলে সজ্ঞানে নিজের লাইসেন্সকৃত বন্ধুক মাথায় ঠেকিয়ে দেন। এ যেন পূর্বের নাটকের বাস্তব প্রতিফলন। লোকটির ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়, মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে বাড়িতে তিনি একাকী সময় কাটান, তিনি বললেন- আমি যদি লাইভে না এসে মরে পড়ে থাকি সেটা কেউ জানবেনা, হয়তো জানবে অনেকদিন পরে'। লোকটার জীবন অর্থহীন মনে হচ্ছিলো, বেঁচে থেকে তার কী লাভ?
কিন্তু চাইলেই লোকটা বেঁচে থাকার অসংখ্য কারণ তৈরী করতে পারতো। একাকী জীবন।
পরিবারের পিছুটান নেই, কারো প্রতি দায়িত্ব নেই। নিজের একাকীটা, অবসর সময়টা সমাজের ভালো কাজে, নিজের ভ্রমণে, আড্ডায়, বই পড়ায়, লেখালিখিতে কাজে লাগাতে পারতেন।
চাইলেই তিনি তার বয়সী মানুষদের নিয়ে সকাল/বিকাল হাটাহাটির কিংবা চা-আড্ডার একটা দল বানাতে পারতেন। সমাজসেবা মূলক কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারতেন, ছেলেমেয়েরা যোগাযোগ রাখে না, বাবার খেয়াল রাখেনা; না রাখুক, বুকের ভিতর কষ্ট থাকবে সেটা সত্য। কিন্তু নিজের তো টাকা পয়সার অভাব ছিলো না, আত্মহত্যার পথ বেঁচে না নিয়ে পথশিশু, এতিমখানায় অসহায় এতিমদের, বৃদ্ধাশ্রম কিংবা বিভিন্ন সদন কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভিন্ন বিষয়ে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারতো, আর এভাবেই সৃষ্টি হত তাঁর নতুন পৃথিবী। তিনি হয়ে যেতে পারতেন অন্য একটা জগতের রাজা।
মানুষের ভালোবাসায় তার চোখ ভিজে যেত হৃদত শান্তিতে তৃপ্ত হত। সব কথায় বললাম ফিউচার ইন দ্যা পাস্ট-এ মানে ভবিষ্যতের যে কাজ সময় অতিক্রম করে অতীতে পরিণত হয়ে গেছে।
কিন্তু আমরা যারা বেঁচে আছি তারা শিক্ষা নিতে পারি নিশ্চয়, তবু নিই না কেন? ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলেছে। আহারে জীবন!
একটা প্রিয় উক্তি দিয়ে শেষ করছি- 'জীবন মানে ঝড় কেটে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করা নয়, ঝড়ের মধ্যে নাচতে শেখা।'

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ