Md. Ashraful Alam
প্রকাশ ১৫/০২/২০২২ ০৪:০৩পি এম

করোনায় শিশু শিক্ষার অপূরনীয় ক্ষতি উত্তরনে জরুরি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ

করোনায় শিশু শিক্ষার অপূরনীয় ক্ষতি উত্তরনে জরুরি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ
ad image
শিক্ষা মানুষের জীবনকে সভ্য সমাজের আয়নায় প্রতিফলন করে দেশ ও জাতি গঠনে এক অনন্য ভূমিকা রাখে। সেই শিক্ষা অর্জনে যেকোন বয়সের নাগরিকের বহুস্তর পারি দিতে হয়। বিভিন্ন স্তর পারি দিয়ে সভ্য মানব, আয় উপার্জন, জীবন জীবিকা পরিচালনা এবং দেশের মানব সম্পদ হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু সেই পথপরিক্রমা যদি হয় প্রাকৃতিক অথবা মানবসৃষ্ট আপদের দ্বারা বাধাগ্রস্থ তখন নাগরিক সমাজের জন্য হয়ে ওঠে দুঃশ্চিন্তার বিষয়। বলছি বৈশি^ক করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়। বন্ধ না করেও উপায় ছিল না। তবে কথা হলো যা হবার হয়ে গেলে। এখন প্রয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা আর বিনিয়োগ। ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলছি না। শিক্ষায় বিনিয়োগ বিশেষ করে শিশু শিক্ষায় বিনিয়োগ।

বৈশি^ক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রদান পদ্ধতি ভিন্নতা রয়েছে এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বলতাও কমনয়। দুর্বল শিক্ষা পদ্ধতিতে বিশে^র সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমাদের শিশুরা বহু রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রতিনিয়ত লড়াই করে থাকে। করোনা মহামারীতে দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমাদের শিশু শিক্ষার্থীরা আরও একবার এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অসহায়ের মতো ঘরবন্দি হয়ে দিন পারি দিচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছি যে কোভিড-১৯ এর থাবায় আমাদের শিশু শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় বন্ধের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হবে আগামী মার্চ মাসে। অর্থাৎ দুটি বছর হয়ে গেলো আমাদের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে যে অপূরণীয় ক্ষতি দৃশ্যমান তা কোন পদ্ধতি দিয়ে পূরণ সম্ভব তা আমাদের ভাবতে হবে। শুধু বিদ্যালয় খুলে দিয়ে পুনরয় শিক্ষায় পাঠদানই যথেষ্ট নয়। কারণ আমরা এও লক্ষ্য করেছি যে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র লেখা পাড়া থেকেই বিরত ছিলো না। তাদের পাঠ্য পুস্তকের বাহিরের জগৎটাও ছিলো বদ্ধ খাঁচায়। তাদের মানসিক বিকাশের জন্য পাঠদান গন্ডির বাহিরে গিয়ে বিনোদন অথবা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিকাশের মতো খেলাধুলার বিষয়ে পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে।

ইউনিসেফ এর এক তথ্য বিবরণী থেকে জানা গেছে, বিগত সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সম্পূর্ণ এবং আংশিকভাবে ৬১ কোটি ৬০ লাখের ও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংখ্যাটি নিশ্চই কারো কাছে কম নয়। আরও জানা গেছে স্কুল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে স্কুলগুলো খোলা হলেও আবার অমিক্রনের প্রভাবে আবার বন্ধ ঘোষনায় এই মাত্রাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংক্রমনের ভয়াবহতায় স্কুল বন্ধ না করে উপায়ও ছিলো না কারণ শিক্ষার চেয়েও জীবনের নিরাপত্তা চিন্তা করা সঠিক ছিলো। বর্তমানে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা আশাবাদি যে খুব শিঘ্রই পরিস্থিতি অনুকুলে আসবে এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় মূখী করতে আমাদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দায়িত্বশীল। কিন্তু কথা হলো এযবৎ যে ক্ষতি হয়েছে কারণ একজন শিক্ষার্থী যখন তার বাল্যকাল অথবা শিশুকাল থেকে বিদ্যালয়গামী হয়ে তার জীবনের প্রথম বীজ বপন করে শিশু শিক্ষার পাঠ রপ্ত করে ঠিক সেই সময়েই দুটি বছর তাদের জীবন থেকে চলে যাওয়ায় সকল অভিভাবক উদ্বিগ্ন। শিশু দুটি বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাড়ান্দায় না যেতে পেরে অনেক কিছুই ভূলে গেছে। একটি গবেষণা প্রতিষ্টানের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই সময়ে শিশু শিক্ষার্থীরা তাদের গণনা ও স্বাক্ষরতার মৌলিক দক্ষতা হারিয়েছে। কারণ বিদ্যালয়ে না যেতে পারা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাঘাত মানে হলো লাখ লাখ শিশু তাদের শ্রেণীকক্ষে থাকলে একাডেমিক যে শিক্ষা অর্জন করতে পারতো তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং লক্ষনীয় যে তুলনামূলক অর্থশালী পরিবারের শিশুরা বিভিন্ন ডিভাইসে কোথাও কোথাও অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতির ফলে কিছুটা চর্চায় থাকলেও প্রান্তিক এবং গ্রামীণ শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মানের অসমতার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং বিদ্যালয় বন্ধ থাকার ফলে দিন দিন এর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।

একটি কথা না বল্লেই নয় যে, সরকারি বেসরকারি ভাবে উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা রাখা হতো। স্কুল বন্ধ থাকার ফলে সেই খাবার থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিরত আছে এবং এই জন্য শিশুর একটি বড় অংশ যথাযথ পুষ্টি গ্রহণ থেকেও বঞ্চিত। ফলে এটিও একটি ভাবনার বিষয় সেক্ষেত্রেও এই অবস্থার বিপরীতে যে পুষ্ঠিহীনতার সম্ভাবনা রয়েছে সেখানেও যথাযথ বিনিয়োগ করে পদ্ধতির উন্নয়ন করতে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য দৃষ্টি রাখা আমাদের দায়িত্ব।
কোভিড-১৯ এর বিরুপ পরিস্থিতির কারনে শিশুদের পাঠদান বিরতীতে যে প্রভাব পরবে বা ইতিমধ্যে পড়েছে সঠিক সময়ে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহন করতে না পারলে এর ভয়াবহতা কয়েক দশক থেকে যেতে পারে। কারণ আজকের যে শিশুটি তাঁর লেখা পড়া থেকে দুটি বছর হারিয়ে ফেলেছে সারা জীবন ব্যাপি তার প্রভাব তাকে বয়ে বেড়াতে হতে পারে। তাই শিশু শিক্ষা এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল স্তরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতি সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টি আজ সময়ের দাবি।

আজকের যে সঙ্কট এটি আমাদের প্রত্যাশিত ছিলো না আমরা কখনই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না সত্যি। কিন্ত এতদিনের শিক্ষা থেকে আমাদের অভিজ্ঞতাও কম হয়নি। তাই আগামী দিনে আবারও এমন পরিস্থিতির কল্পনায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারনে পিছিয়ে থাকা সমীচিন হবে না বোধ হয়। শিক্ষায় কোন শিশু যেন পিছিয়ে না থাকে। পিছিয়ে থাকা শিশু দায়িত্বশীল দেশ ও জাতি গঠনে আমাদের ব্যার্থতায় প্রমাণিত হতে পারে। শিশু সুরক্ষায় অভিভাবক, শিক্ষক, রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ববান মানুষকে আন্তরিক হয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে পরিস্থিতি অনুকুলে নিয়ে আসতেই হবে। নয়তো যুগ যুগ ধরে এই দায় আমাদেরকেই বহন করতে হবে সমাজে এবং পরিবারে।

ইউনিসেফ এর অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ১৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে সর্বত্র সব শিশুর জন্য ভালো একটি পৃথিবী গড়ে তুলতে তাঁরা (ইউনিসেফ) কাজ করছে। শিশুদের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে, তাদের অধিকার সমুন্নত রাখতে এবং তাদের মধ্যে থাকা সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করতে ইউনিসেফের সদস্য হয়ে বিভিন্ন দেশ বেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। তাঁরা এটিও বলেছে যে, সাম্প্রতিক দশকে শিশু অধিকারের অগ্রগতিতে আমাদের অঞ্চলে যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে করোনার থাবায় তা এখন ঝুঁকির মধ্যে। যদি এখনই পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার হয়, তবে এই ভোগান্তী হবে আগামী কয়েক ধরে অনুভূত হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে এমন ভাবে যাতে প্রতিটি শিশু শুধু টিকেই থাকবে না বরং নিজেদের সমৃদ্ধিতে বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। তাই বার বার বলা হচ্ছে শিশু শিক্ষা সংশ্লিষ্ট পাঠ্য পরিকল্পনায়, উপকরণ, পদ্ধতি অগ্রাধিকার, স্বাস্থ্য পুষ্টি নিশ্চিত, পারিবারিক দারিদ্রতা হ্রাসে, বিদ্যালয় উপকরণ পুর্ণগঠনে, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে, উন্নত ডিজিটালাইজেশন, কারিকুলাম বিভাজন নিরসন, বিনোদন প্রক্রিয়ায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার বিবেচনায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

আবার ও বলতে হয় সঠিক যাচাই বাছাই করে সঠিক পরিকল্পনা এবং অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে শিশুর জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রত্যাশিত উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ জুরুরী। তবে জাতিয় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবশ্যই অধিকতর গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করতে সাধারণ অভিভাবগণ একমত পোষণ করবেন নিশ্চয়ই। শিশুদের জীবন বাঁচাতে সহায়তা করতে, তাদের অধিকার সমুন্নত রাখতে এবং তাদের মধ্যে থাকা সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। আসুন সকলের আন্তরিক চিন্তা আর একাগ্রতায় শিশু শিক্ষার ক্ষতি কাটিয়ে অসমতার অবসান করি। মানসম্মত ও সমতার শিক্ষায় সকল শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ি।

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ