Monjurul Islam - (Dhaka)
প্রকাশ ২৬/০১/২০২২ ০৬:৩৮এ এম

বিপর্যয়ের মুখে পৃথিবী

বিপর্যয়ের মুখে পৃথিবী
ad image
মানবজাতি—যাদের জন্ম মূলত নক্ষত্র থেকে।

অন্তত সময় ধরে এমন একটি জগতে বসবাসরত

যাকে তারা পৃথিবী বলে ডাকে—বর্তমানে

সমুদ্রের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ চলা শুরু করেছে।

—মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি, কার্ল সাগান

গবেষকেরা পৃথিবীতে মধ্যযুগব্যাপী গামা রশ্মি বিস্ফোরণের তীব্র আঁচের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। এটা সুদূর মহাশূন্যে কোনো বিস্ফোরণ থেকে নির্গত হয়ে ছুটে এসেছে। হাজার আলোকবর্ষে সংঘটিত না হয়ে শত আলোকবর্ষে হলে নাকি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত।

এত দিন বিতর্ক থাকলেও বর্তমানে বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুটো কৃষ্ণগহ্বরের পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ বিশাল পরিমাণে গামা রশ্মি শক্তি মুক্ত করেছিল। তারই আঘাতের চিহ্ন বিভিন্ন উদ্ভিদে আমরা দেখি। রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র থেকে তা জানা গেছে। তার মানে হচ্ছে, শুধু ধূমকেতুর নয়, নানা রকম মহাজাগতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে পৃথিবী।

অষ্টম শতাব্দীর দিকে মারাত্মক গামা রশ্মি বিস্ফোরণের ধাক্কা পৃথিবীতে এসে লেগেছিল। এটা নাকি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সবচেয়ে শক্তিশালী গামা রশ্মি বিস্ফোরণের একটি। এর কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের পারস্পরিক সংঘর্ষকে দায়ী করেছেন। এতে বিপুল পরিমাণে গামা রশ্মি মুক্ত হয়েছিল। সেই আঘাতের চিহ্ন বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বরফের মধ্যে রয়ে গেছে। গামা রশ্মি হচ্ছে, দৃশ্যমান আলোর মতো একধরনের বিদুৎ–চুম্বকীয় তরঙ্গ। তবে কম্পাঙ্কের হার ১০ হাজার গুণ বেশি, যা ১০ ফুট কংক্রিটের দেয়াল ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এ ধরনের গামা রশ্মির চিহ্ন পরমাণু বা হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণে লক্ষ করা যায়।

প্রকৃতিতে রেখে যাওয়া চিহ্ন

মধ্যযুগে গামা রশ্মির তীব্র আঁচের সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে উদ্ভিদ ও বরফে। এটা ২০১২ সালে গবেষকেরা জানতে পারেন। এ ব্যাপারে জাপানের প্রাচীন সিডারগাছের কথা উল্লেখ করেছেন তাঁরা। সেখানে আইসোটোপ তেজস্ক্রিয় কার্বন ১৪–এর (কার্বন মৌলের একটি ধরন) অস্বাভাবিক মাত্রা লক্ষ করেছেন। অ্যান্টার্কটিকার বরফেও এ ধরনের তেজস্ক্রিয়তা দেখা গেছে। তবে তা আইসোটপ তেজস্ক্রিয় বেরিলিয়াম ১০ (বেরিলিয়াম মৌলিক পদার্থের একটি ধরন)–এর। আবহমণ্ডলের ওপরের অংশে নাইট্রোজেন পরমাণুতে তীব্র বিকিরণের আঘাতে এ ধরনের আইসোটপের সৃষ্টি হয়।
এ ধরনের আইসোটোপ মূল মৌলের চেয়ে রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে তেমন ভিন্ন নয়। তবে নিউক্লিয়াস (পরমাণুর কেন্দ্র) ও প্রাণিজগতের ওপর তার প্রভাব ব্যাপক। গাছের চক্র এবং বরফখণ্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন যে এই ঘটনা ৭৭৪ থেকে ৭৭৫ সালের মধ্যে ঘটেছিল। তবে এই বিকিরণ মহাশূন্য থেকে এসেছিল। শুধু তা–ই নয়, ৩ থেকে ১২ হাজার বছরের দীর্ঘপথ অতিক্রম করে এই শ্যামল পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল।

প্রথম দিকে গবেষকেরা এ ঘটনার পেছনে সুপারনোভা অর্থাৎ বিস্ফোরণোন্মুখ নক্ষত্রের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেছিলেন। এ ধারণা বাতিল হয়ে যায়। এ রকম ঘটলে এখনো সেখান থেকে নিক্ষিপ্ত এবং সরে যাওয়া টুকরোগুলোকে টেলিস্কোপে দেখা যেত। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক দল গবেষক বলেন, অস্বাভাবিক বিশাল সৌর ফ্লেয়ার বা সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে আগুনের উচ্ছ্বাস পৃথিবীতে এসে ঝাপটা মেরেছিল। সাধারণভাবে এ সময়গুলোতে সূর্যপৃষ্ঠ থেকে প্রতি সেকেন্ডে ১৬ হাজার কোটি মেগা টন শক্তি নিঃসরণ করে, যা হিরোশিমায় নির্গত পরমাণু বোমার চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি। কিন্তু ওই সময়ে শক্তিমাত্রা আরও বেশি ছিল। ওই বিজ্ঞানী দলের অনেকে এর সঙ্গে একমত হতে পারেননি। কারণ, সন্ধান পাওয়া আইসোটোপ কার্বন ১৪ ও বেরিলিয়াম ১০–এর উত্পন্নের সঙ্গে সোলার ফ্লেয়ারে উত্পন্ন শক্তি তুলনীয় নয়।

এরপর জার্মান পদার্থবিজ্ঞানীরা জানালেন, লাখ লাখ আলোকবর্ষের ব্যাপ্তি নিয়ে থাকা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রচণ্ড এক ভারী বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়েছিল। দুটি গ্যালাকটিক বস্তুর সংঘর্ষে সৃষ্ট বিস্ফোরণের প্রবল বিকিরণের ঢেউ গ্যালাক্সিব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্যালাকটিক বস্তুগুলো হতে পারে নিউট্রন নক্ষত্র, এমনকি কৃষ্ণগহ্বর পর্যন্ত। সূর্যের চেয়ে ৯ গুণ বেশি ভরের বস্তুই এ ধরনের পরিণতি বরণ করে। ১৯৩২ সালে নিউট্রন কণা আবিষ্কারের পরপর ডেভিডোভিচ ল্যান্ডাউ প্রথমে নিউট্রন নক্ষত্রের কথা বলেছিলেন। এ ধরনের নক্ষত্রে ইলেকট্রন–প্রোটন বলে কিছু থাকে না। বস্তুর চাপ শেষ পর্যন্ত এমন প্রবল হয় যে ইলেকট্রনের গতিবেগ আলোর গতিবেগের কাছাকাছি এসে যায়। ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং প্রোটনকে নিউট্রনে রূপান্তর করে। আরও বেশি ঘনত্ব ও চাপে নিউক্লিয়াস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। পুরো নক্ষত্র শুধু নিউট্রন ভরা প্রকাণ্ড এক নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। নক্ষত্রটি বিশাল এক নিউট্রনের পিণ্ড। নিউট্রন নক্ষত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অভিকর্ষ ও অধঃপতিত নিউট্রনের চাপের ভারসাম্য। এ ধরনের নক্ষত্রের ভর সূর্যের তুলনায় ১ থেকে ৩ গুণের সমান। অথচ এ ধরনের ভরের নক্ষত্র যদি নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হয়, তাহলে তার ব্যাস হবে মাত্র ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার। অনেকটা নারায়ণগঞ্জ শহরের মতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীতে এক চা–চামচ নিউট্রন নক্ষত্রের পদার্থের ওজন হলো পাঁচ শ কোটি টন। আর মানুষকে নিউট্রনের ঘনত্ব দিলে তার আকৃতি আলপিনের সমান হবে।

এই গবেষণাপত্রের লেখক, জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক র‍৵ালফ নেউহসার বলেছেন, ‘কয়েক সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত গামা রশ্মি বিস্ফোরণের বর্ণালির দিকে তাকিয়েছিলাম। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম, এটি সন্ধান পাওয়া কার্বন ১৪ ও বেরিলিয়াম ১০–এর উত্পাদন হারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বর, নিউট্রন নক্ষত্র বা সাদা বামন নক্ষত্রের বিস্ফোরণে গামা রশ্মি তৈরি হয়।’ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাডরিয়ান মেলট বলেছেন, যদিও এই সংক্ষিপ্তকালের গামা রশ্মির বিস্ফোরণ একটা সম্ভাব্য উপসংহার, তবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণে বলা যায়, সোলার ফ্লেয়ারের ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সোলার ফ্লেয়ার ও স্বল্প সময়ের গামা রশ্মি বিস্ফোরণ সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। অবশ্য সম্ভাবনা হারের ওপর ভিত্তি করলে ওই সময়কালের মধ্যে বিশ্বে গামা রশ্মি বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা ১০ হাজার গুণ কম। র‍্যালফ নেউহসার বলেন, এ ধরনের ঘটনা পরপর ঘটা অসম্ভব। এখন ঘটলে আরও অনেক আঘাতের চিহ্ন দেখা সম্ভব হতো। অষ্টম শতাব্দীর মতো একই দূরত্বে মহাজাগতিক বিস্ফোরণ ঘটলে এটা কড়া নাড়ত আমাদের কৃত্রিম উপগ্রহগুলোকে।

এই গামা রশ্মি বিস্ফোরণ দুর্লভ। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্যালাক্সিতে খুব বেশি হলে প্রতি ১০ হাজার বছরে একবার ঘটে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ রকম একটি নাটকীয় ঘটনা সম্পর্কে মধ্যযুগের পূর্বপুরুষেরা অবগত ছিলেন না; তখন জাতিগোষ্ঠীগুলো তাদের অস্তিত্ব বজায়ের মরণ লড়াইয়ে ব্যস্ত—হাইপেশিয়া, আর্যভট্ট, খনা, ইবনে সিনা, গ্যালিলিও গ্যালিলি, ব্রুনো আরও কত নাম এই সময়ের বলি। এখনো তা নানাভাবে অব্যাহত। র‍্যালফ নেউহসার বলেন, এ ধরনের বিস্ফোরণ হাজার আলোকবর্ষ না হয়ে শত আলোকবর্ষ দূরে ঘটলেও এটা পৃথিবীর ওজোন স্তর ও প্রাণিজগৎকে ধ্বংস করে ফেলত। অজান্তে মহাজাগতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতো পৃথিবী।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঠান্ডা পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা শেষ হয়ে যায় বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের শেষ দিকে। সায়েন্স ফিকশন কিংবদন্তি আর্থার সি ক্লার্ককে একবার মানবসভ্যতা ধ্বংসের আশঙ্কা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি উত্তরে ৫১ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশের কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ ১ শতাংশ পৃথিবীর আয়ু বৃদ্ধির কথা বলেছিলেন। পরে এর ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিপদ লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে।’ আর কার্ল সাগান বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব মহাজগতে আমাদের সীমানার বিস্তার ঘটাতে পারব। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারব। ফলে এ ধরনের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আমাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারব।

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ