Parvin - (Chandpur)
প্রকাশ ২৬/০১/২০২২ ০৬:১২এ এম

Church: কর্ভোডার চার্চ

Church: কর্ভোডার চার্চ
ad image
নিচের ছবিটি স্পেনের কর্ডোভার এর একটি চার্চের । চার্চের স্থাপত্যশৈলী দেখে অবাক হচ্ছেন, মসজিদে নববীর সাথে যেন অনেক মিল ! মিল তো থাকবেই, এটি ছিল Mosque of Cordova. মুসলিমদের পরাজয়ের পর ক্রুসেডাররা সেটিকে গির্জায় পরিণত করে । আজ যখন সারা পৃথিবীতে মুসলিমরা অমুসলিম কালচারে বিলাসিতায় নিজেদের বিলিয়ে দেওয়ায় ব্যস্ত, আজ তখন ক্রুসেডাররা তৎকালীন Mosque of Cordova এ আন্দালুসিয়ায় মুসলিমদের পতনের স্মৃতি রোমন্থন করে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করছে ।

একটা জাতি নিজেদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ভুলে গেছে । আর অপরপক্ষে তারাই পৃথিবী আজ শাসন করছে যারা ইতিহাস মনে রেখেছে ।

আমাদের আন্দালুসিয়া ! আহ্ ।

কয়টা মুসলিম আন্দালুসিয়া কে জানে ?

সময়টা ছিল পবিত্র রমজান, হিজরতের ৯২ বছর পরের ঘটনা । ইউরোপ বিজয়ী আমাদের সুপার হিরো তারিক বিন যিয়াদ মাত্র ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে পা রাখেন আন্দালুসের মাটিতে ।

৭১১ সালের ২৯ এপ্রিল স্পেনের সীমানায় একটি পাহাড়ের কাছে সেনাসমাবেশ করেন তিনি। পরে তার নামেই ওই পাহাড়ের নাম রাখা হয় ‘জাবাল উত তারেক’। এর অর্থ ‘তারেকের পাহাড়’। সেটাকেই ব্যাপকভাবে ডাকা হয় ‘জিব্রালটার’।

ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকাকে ভাগ করেছে জিব্রালটার প্রণালী। সরু এই প্রণালীর একদিকে আটলান্টিক, অন্যদিকে ভূমধ্যসাগর। আর ইউরোপের ভূখন্ডে আইবেরিয় উপদ্বীপ। তিনদিকে সাগরবেষ্টিত এই উপদ্বীপটিই আন্দালুসিয়া। আজকের স্পেনের স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল।

সমুদ্র পাড়ে দাঁড়িয়ে তারিক বিন যিয়াদ সৈনিকদের উদ্দেশ্যে হৃদয় কাঁপানো ভাষণ দেন,

'হে আমার ভাইয়েরা আমাদের পেছনে পানি, সামনে শত্রু এখান থেকে পালানোর কোন সুযোগই নেই । আমরা অবশ্যই ধৈর্যের সাথে আল্লাহর প্রতি বিশ্বস্ত ও অনুগত থেকে লড়ে যাব । আর আমি আপনাদের সামনে থেকেই লড়বো ।'

ক্রুসেডার রডারিক তখনই অঞ্চলের অত্যাচারিত রাজা । অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে অঞ্চলের ইহুদি এবং অন্যান্যরা সাহায্যের জন্য চিঠি পাঠান উত্তর আফ্রিকার রাষ্ট্রপ্রধান মুসা ইবনে নুসাইয়ের এর কাছে ।

তার নির্দেশে মাত্র ১২০০০ সৈনিক নিয়ে রডারিকের লক্ষাধিক সৈন্যের সাথে যুদ্ধ করে জয়ী হন তারেক বিন যিয়াদ ।

আন্দালুস কে বলা হয় ইউরোপের বাতিঘর । গোটা ইউরোপ ছিল তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত । আর আন্দালুস থেকে ছড়ানো আলো গোটা ইউরোপকে করে আলোকিত ।

এটা ছিল এমন এক অঞ্চল যেখানে মানুষ বছরে মাত্র একবার দুবার গোসল করতো, এ ছিল ওই অঞ্চলের বিশ্বাস বা সংস্কৃতির অংশ । তারা মুসলিম দের গোসল ও দৈনিক পাঁচবার অজু করতে দেখে নিজেদের মাঝে পরিবর্তন আনে।

আজকে রাস্তার উপরে যে লাইটিং দেখেন, আন্দালুসিয়ায় মুসলিমরাই প্রথম রাস্তার উপর লাইট এর ধারণা নিয়ে আসেন ।

পূর্বের আরব রাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোকে সবদিক থেকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল আল-আন্দালুস। রোমানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া ইঞ্জিনিয়ারিং আর শহরের পরিকল্পনার সঙ্গে ইসলামি স্থাপত্যকলা মিশিয়ে নতুন করে গড়া হলো আন্দালুসের শহরগুলো। ভ্যালেন্সিয়া আর সেভিল ছিল বর্তমানের দুবাই কিংবা দোহার মতো বিলাসবহুল শহর।

আর আন্দালুসের কর্ডোভা ! কি আর বলব তার সম্পর্কে ! আমরা কজনই কর্ডোভার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের খোঁজ রাখি ।

জ্ঞানবিজ্ঞানে কর্ডোভার খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। এই নগরীর প্রত্যেক নরপতিই ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞানসেবক। জ্ঞানবিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কর্ডোভাই ছিল ইউরোপের পথপ্রদর্শক। প্রখ্যাত মুসলিম ভূগোল বিশারদ ইয়াকুত আল হামাবির মতে, কর্ডোভা ছিল গোটা আন্দালুসের প্রাণকেন্দ্র।

একাদশ শতাব্দীতে জ্ঞানবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি সর্বক্ষেত্রেই কর্ডোভা হয়ে উঠেছিল গোটা বিশ্বের অগ্রণী নগর। ইউরোপের বহু খ্রিস্টান বিদ্যা অর্জনের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন এই নগরীতে। তাদের অনেকে পেশাজীবী হিসেবে এই শহরেই বাস করতেন। অনেকে এখান থেকে বিদ্যা আহরণ করে পিরেনিজ পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে চলে যান ইউরোপে। তখন তারাই হয়ে যান অবশিষ্ট ইউরোপের মহাজ্ঞানী। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের শিল্প, সাহিত্য ও সভ্যতায় সেকালের কর্ডোভার প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়। নগর সভ্যতার এতটা উৎকর্ষ সে কালের আর কোনো নগরীর ভাগ্যে জোটেনি।

সে সময় গোটা কর্ডোভায় পাঁচ শতাধিক লাইব্রেরি ছিল। তৎকালীন ইউরোপে গোসলখানাকে নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, অথচ কর্ডোভাতে ছিল ৯০০ পাবলিক বাথ। দশম শতকে কর্ডোভাতে ছিল ৭০০ মসজিদ।

শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান সাধনায় নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নেও কর্ডোভা ছিল সেকালের রোল মডেল। চামড়া, লোহা, সুতা, রেশম এবং বস্ত্রসহ বহুমুখী উৎপাদনের কেন্দ্রও ছিল এই কর্ডোভা। ইউরোপের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাপড় তৈরি হতো এই ভূখণ্ডেই। কৃষি খাতেও কর্ডোভা ছিল বহু এগিয়ে। সেকালের চাকা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেচ কাজ পরিচালিত হতো। মরুময় আরবের কঠোর পরিশ্রমী জাতি এখানে সোনার ফসল ফলাতে লাগল। নানা ধরনের সবজি ও ফলফলাদি বেশ সহজেই উৎপাদন হচ্ছিল। এসব উৎপাদন কর্ডোভার অর্থনীতিকে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বায়ুকলের ব্যবহার গোটা ইউরোপের মাঝে এই ভূখণ্ডেই সর্বপ্রথম হয়েছিল।

লেখাটা ছোট রাখার খুব চেষ্টা করা সত্ত্বেও বড় হয়ে গেল ।

প্রায় সাড়ে ৭০০ বছরের অধিক সময় মুসলিম শাসনের ইতিহাস, চাইলেই কে অল্প কথায় ব্যক্ত করা যায় ।

মুসলিমদের পরাজয়ের পর আন্দালুসে প্রবেশ করে ক্রুসেডাররা প্রথমে যে কাজটি করে তা হল গ্রন্থাগার সমূহের সকল বই পড়ানো । আন্দালুস দখলের পর ইসলামবিদ্বেষী একজন বিশপের নেতৃত্বে কর্ডোভার প্রাণকেন্দ্রে এক চত্বরে প্রায় ৮০০০০ বই পড়ানো হয় । তাদের ধারণা ছিল এসব বই পুড়িয়ে দিলেই মুসলিমদেরকে তাদের শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দূরে রাখা যাবে ।

নির্যাতন-নিপীড়ন ঠেকাতে রক্তপাত বন্ধ করতে মুসলিমদের আগমন ঘটেছিল ইউরোপে । আর মুসলিমদের পরাজয়ের পর বেদনাবিধুর রক্তাক্ত এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল ।

মুসলিম নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব আর বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ নেয় প্রতারক রাজা ফার্ডিন্যান্ড ও তার স্ত্রী ইসাবেলা ।

প্রতি তিন লক্ষ মুসলিমকে হত্যা করা হয় ।‌ ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যারা মসজিদে এবং সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ আশ্রয় নিবে তারা বেঁচে যাবে । পরে মসজিদের গেট বন্ধ করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ