Md. Ashraful Alam
প্রকাশ ০৯/০১/২০২২ ০২:০৬পি এম

Omicron: অমিক্রন সতর্কতায় প্রয়োজন 'পূর্ণ সমীকরণ'

Omicron: অমিক্রন সতর্কতায় প্রয়োজন 'পূর্ণ সমীকরণ'
ad image
কোভিড-১৯ দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তে একের পর এক তান্ডব চালিয়ে চলছে। শতাধিক রুপ পরিবর্তন করে একেকবার একেক ভেরিয়েন্ট হয়ে নাস্তানাবুদ করছে মানুষকে। এই ভাইরাসের ভিন্ন ভিন্ন রূপের সঙ্গে লড়াই করতে করতে আমরা অনেক ক্লান্ত। বিগত দিনে একাধিক ভেরিয়েন্টের সঙ্গে লড়াই করে আমরা দ্বিতীয় ঢেউ পার করেছি।

ব্যাপক ক্ষতির রেশ না কাটতেই করোনার নতুন রূপ অমিক্রন আঘাত হানা শুরু করলো। ইতিমধ্যে কোথাও কোথাও সংক্রমনের সর্বোচ্চ চুড়ায় পৌছে গেছে অমিক্রন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই ভাইরাস আগের করোনা ভাইরাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি সংক্রামক। বয়স্ক, শিশু, মধ্যবয়সীসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষের শরীরে এর সংক্রমণ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। একটি দৈনিক পত্রিকার খবরে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি দেশে থাবা বসিয়েছে অমিক্রন। আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে সংক্রমনের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

গত ১০ ডিসেম্বর আফ্রিকা ফেরৎ এক নারী ক্রিক্রেটারের শরীরে অমিক্রন শনাক্ত হয়। বর্তমানে একমাসের মাথায় এই সংক্রমনের সংখ্যা ২০ জনে দাড়িয়েছে। তবে বাস্তবে এই সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। কারণ সকলকে হয়তো পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো ১জনের শরীরে ধরা পরার পর তাকে আইসোলেশনে রাখার পরও বাকি ২০ জনের মধ্যে কিভাবে শনাক্ত হলো? তার মানে এই ভেরিয়েন্ট বাহি কেউ না কেউ বাহিরে ঘুরছে। আর সেখান থেকে বাকিরা সংক্রমিত হচ্ছে। শীতকালে সাধারণত প্রায় প্রতিটি পরিবারে অনেকেরই ঠান্ডা লাগছে। ঠান্ডার ফলে কোনটা সাধারণ ফ্লু কোনটা ভাইরাস আর কোনটা যে করোনা অমিক্রন তা বোঝা অনেকটা মুশকিল। চিকিৎসকরা বলছেন, কয়েকটি লক্ষণ বা উপসর্গের দিকে নজর দিলেই নিজের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাধারণ ঠান্ডা লাগা আর ওমিক্রনের উপসর্গের পার্থক্য খুবই সামান্য। তাই একমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমেই জানা সম্ভব, কোনটি কোভিড সংক্রমণ। তাই যে কোন ধরনের উপসর্গ দেখা দিলেই অবহেলা এবং দেরি না করে পরিবার থেকে নিজেকে আলাদা করে নেওয়া। এতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নিরাপদ থাকতে পারে। এরপর কোভিড পরীক্ষা করা।

এখন পর্যন্ত আশার কথা হলো নতুন এই ভেরিয়েন্ট অমিক্রন সংক্রমনের হার ব্যাপক হলেও তা মহামারি আকার ধারণ করেনি। সংক্রমনের উপসর্গ মৃদু এবং আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও কম। তবে উৎকন্ঠার বিষয়টি হলো বিগত সময়ে ডেল্টা ভেরিয়েন্টের কারনে মানুষের শরীরে যে সমস্ত দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যার কথা জানা গেছে তা সুখকর নয়। আগের ভেরিয়েন্ট দ্বারা শিশুদের সংক্রমনের খবর কম হলেও বর্তমানে অমিক্রন দ্বারা শিশুদের ও সংক্রমনের হার আগের তুলনায় বেশি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমরাও বিগত দিনে সাহসের সাথে কোভিড-১৯ এর সকল ধরণ মোকাবেলা করে অভ্যস্ত। এখন শুধু মনে প্রাণে বিশ্বাস,গুরুত্ব এবং সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে জানতে হবে এবং মানতে হবে স্বাস্থ্য বিধি। কিন্তু কথায় আছে কাজীর গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নেই। বাস্তবে সকল অফিস আদালত, পরিবহন শপিংমলসহ বিভিন্ন স্থানে নো মাস্ক নো সার্ভিস কথাটি রঙ্গিন ভাবে লেখা থাকলেও কোন স্বাস্থ্য বিধির বালাই নেই। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন চিকিৎসকের মতামতের ভিত্তিতে সাধারণ ফ্লু, করোনা এবং ঠান্ডা লাগার কিছু উপসর্গ সম্পর্কে জানা গেছে। এইসব উপসর্গ থেকে আমরা কিছুটা বুঝতে পারি যে কোনটি কোভিড এবং তা পরীক্ষার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যেমন-

কোভিড উপসর্গ : শুকনো কাশি- হয়, জ্বর- হয়, নাক শুকনা কিন্তু মাঝে মাঝে বন্ধ, মাঝে মাঝে গলাব্যথা, মাঝে মাঝে-শ্বাসকষ্ট, মাঝে মাঝে- মাথাব্যথা, মাঝে মাঝে-গায়ে ব্যথা, মাঝে মাঝে- ক্লান্তি এবং কম পরিমানে পেট খারাপ হয়।

সাধারণ ফ্লু উপসর্গ : শুকনো কাশি- হয়, জ্বর- হয়, মাঝে মাঝে- নাক বন্ধ, মাঝে মাঝে-গলাব্যথা এবং মাথাব্যথা করে, গায়ে ব্যথা হয়, ক্লান্তি- হয়, মাঝে মাঝে পেট খারাপ হতে পারে।

ঠান্ডা লাগার উপসর্গ : মাঝে মাঝে শুকনো কাশি, কম পরিমানে জ্বর, মাঝে মাঝে নাক বন্ধ হয়, হালকা গলাব্যথা হতে পারে।
মোটামুটি এসব লক্ষণগুলো সাজিয়ে নিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে অনুমান করতে হবে কোন উপসর্গ গুলো কোন ধরনের রোগের সাথে মিলে যায়। তখন সচেতন ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী। মনে রাখতে হবে করোনার একাধিক ঢেউ আসতে পারে তাতে আতংকিত না হয়ে প্রস্তুতি নেওয়াটাই রক্ষার অন্যতম উপায়।

অমিক্রনের লক্ষণ ?
অমিক্রনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা দিচ্ছে মৃদু উপসর্গ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রোগ অত্যন্ত সংক্রামক হলেও তা অতি খারাপের দিকে যাচ্ছে না। তবে আপনাকে থাকতে হবে সচেতন। এক্ষেত্রে সামান্য জ্বর, গায়ে ব্যথা, গলা ব্যথা, স্বরে পরিবর্তন ইত্যাদি সমস্যা দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাদ, গন্ধও চলে যাচ্ছে। তবে রোগী বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাড়িতেই ভালো হয়ে যাচ্ছেন। তবে রোগ থেকে সেরে ওঠার পর শরীরে কী ধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ছে এই নিয়ে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

কতদিনের মধ্যে অমিক্রনের উপসর্গ দেখা যেতে পারে ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরে কোভিড ঢোকার পর থেকেই এক একটি কোষের দখল নেবে এবং নিজের প্রতিলিপি বানাতে শুরু করবে। একটা সময়ের পর গিয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই রোগের কাছে হেরে যাবার পর দেখা দেবে লক্ষণ। ফলে আগের তুলনায় একটু কম সময়ে ২ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই শরীরে অমিক্রনের লক্ষণ দেখা যাবে। উপসর্গ গুরুতর না হলেও অমিক্রনকে হালকাভাবে নেওয়া মোটেও উচিৎ হবে না।

অমিক্রন সন্দেহে করনীয়
প্রচলিত লক্ষণ দেখা দিলে আর অপেক্ষা নয়। নিজেকে প্রথমত আইসোলেট করতে হবে। তারপর চিকিৎসকের পরামর্শ এবং তাঁর কথা মতো করতে হবে টেস্ট। এক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আরটিপিসি-আর টেস্ট করা টা বুদ্ধিমানের কাজ কারণ এই টেস্ট সঠিক রিপোর্ট দেয়।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রনে আমাদের দায়িত্ব
কোনও মানুষই কোন রোগে আক্রান্ত হতে চান না। সেক্ষেত্রে সমস্যা প্রতিরোধ করতে মেনে চলতে হবে কঠোর স্বাস্থ্য বিধি। মাস্ক পরতেই হবে। পাশাপাশি যখনই সময় পাওয়া যাবে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে ঘষে হাত ধুতে হবে। এছাড়া জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে, গ্রহণ করতে হবে দুই ডোজ টিকা।
আমাদের সরকারের সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যেই গত ৪ জানুয়ারি করোনাভাইরাসের আফ্রিকান ধরন অমিক্রন ঠেকাতে ১৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, অমিক্রন আক্রান্ত দেশ থেকে আগত যাত্রীদের বন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং এবং ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা সব ধরনের জনসমাগম নিরুৎসাহিত করা, প্রত্যেক ব্যক্তিকে বাড়ির বাইরে সর্বদা সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, রেস্তোরাঁতে ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক বা তার কম লোক বসে খেতে পারবে. সকল প্রকার জনসমাবেশ, পর্যটন স্থান, বিনোদন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হল/ থিয়েটার হল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ধারণক্ষমতার অর্ধেক বা তার কমসংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করতে পারবে, মসজিদসহ সব উপাসনালয়ে মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা,গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিধি নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সেবাগ্রহীতা ও সেবাপ্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বদা সঠিকভাবে মাস্ক পরাসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে, যারা এখনো কোভিড-১৯-এর টিকা গ্রহণ করেননি টিকাকেন্দ্র গিয়ে তাদের কোভিড-১৯-এর প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।

দেশব্যাপী এই সকল নির্দেশনাসমূহ কঠোরভাবে পালনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছে। রাষ্ট্রের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে এসকল বিধিনিষেধ মেনে চলা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী । তা না হলে সকলের জন্যই বিপদ অসন্ন। সরকারি এবং বেসরকারিভাবে সেবা প্রদানকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যে যার অবস্থান থেকে এই দায়িত্ব পালনের বিকল্প আছে, না কি নেই সেই প্রশ্ন এবং উত্তর দুটোই তাদের কাছে। কথায় বলে পঁচা শামুকেও পা কাটে। তাই আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সচেতনতাই পারে আমাদেরকে অমিক্রন সংক্রমনের ব্যাপকতা থেকে নিরাপদে রাখতে।

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ