Motior Rahman Sumon - (Mymensingh)
প্রকাশ ২৬/১২/২০২১ ০৬:৩৬এ এম

চক্রাকারে জীবন- এম. আর. সুমন

চক্রাকারে জীবন- এম. আর. সুমন
ad image
মেয়েটির বয়স আজ ৩০ ছুঁই ছুঁই। এক কালে রূপের জৌলুশে পাগল থাকতো কত ছেলে-পুরুষ। আজ গৃহকোণে সাহিত্যপাতা উল্টিয়ে সময় কাটে। এক সময় সাহিত্য ছিলো দুচোখের বিষ। আজ তাই হয়েছে সঙ্গী।

কুঁড়িতেই বুড়ি কথাটি সবার ক্ষেত্রে সত্য না হলেও একটা নির্দিষ্ট সময় অতিক্রমের পর বিয়ের বাজারে মেয়েদের কদর একেবারে কমে যায় অনেকটা পরিত্যক্ত পঁচা মালের মত। কেউ হয়তো কষ্ট পেতে পারেন এই ভেবে মেয়েকে বাজারের সাথে তুলনা করলাম তারপর পঁচা মালের সাথে! এইটুকুতে আর কী কষ্ট! পঁচা মাল ফেলে দেওয়া যায় ডাস্টবিনে। বিয়োজক রূপান্তরিত করে মিশিয়ে দেয় মাটিতে কাজে আসে জৈব সার হিসেবে।
যদিও আজ বদলে গেছে সমাজের অনেক দৃশ্য তবে একটা সময় ঠিক এমনটায় ছিল। মেয়ে মানেই ছিলো মাথার বোজা।

বর্তমানেও বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত পরিবারে যেই মেয়েটার বিয়ের বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে সেই মেয়েটার কেমন অবস্থা হয় ছেলে হয়ে সেটা অনুধাবন করা পুরোপুরি সম্ভব পর নয় তবু যে টুকু বুঝতে পারি সেটাতে স্বস্তি পাইনা। তবে একজন মায়ের কিংবা একজন বাবার কতটা অস্বস্তি হয়, কষ্ট পেতে হয় আর চিন্তায় চিন্তায় তাদের কীভাবে রাত কাটে সেটা বেশ টের পাই, কিভাবে পাই সেটা বলা মুশকিল তবে চারপাশ আমাদের অনেক কিছুই দেখায়, শেখায় এভাবেই হয়তো।

রাবেয়ার বয়স আর বলা যায় না! বৃদ্ধ বাবা রাবেয়াকে নিয়ে উপস্থিত হয় পাত্র পক্ষের সামনে। রাবেয়ার আর ভালো লাগেনা বারবার এভাবে অপমান সহ্য করে পাত্র পক্ষের সামনে হাজির হতে। রহমত মিয়ারও খারাপ লাগে তবু এ কাজ না করেও সে পারে না। রাবেয়ার চোখে পানি আর বাবার চোখে? তা দেখা যায় না, মুখে হাসি নিয়ে শুধু বলে কই মা চল।

ঘটা করে আনন্দোৎসবে মেয়ে দেখা প্রচলনটা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে আজ অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে বটে পুরোটা নয়। ছেলে পক্ষের জন্যে ইহা আনন্দোৎসবের মত। কিন্তু বৃদ্ধ বাবার বয়স্কা মেয়েকে দেখে না সূচক শব্দটি জানিয়ে দেওয়ার পর তাদের জন্য তা কতটা অপমানের কষ্টের তা হয়তো এই সমাজ কখনো বুঝবেনা। বুঝেও কী কোন উপায় আছে?

রহমত মিয়া এতো সহজসরল মানুষ যে, মেয়ের গুণকীর্তন করতে গিয়ে নির্দ্বিধায় বলে রাবেয়া মাস্টার্স পাশ দিয়েছে, ছোট ছেলে রসুও মাস্টার্স এ পড়ছে; আমার ছেলেমেয়েরা সবাই খুব মেধাবী।
পাত্র পক্ষ বুঝে যায় মেয়ের বয়স কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে! বিয়েটা আর হয়না।

রাবেয়ার একমাত্র ছোট ভাই রসু যাকে সবাই খোকা বলে ডাকে। বাবা(রহমত মিয়া) চাকরী থেকে অবসরে গেছে অনেকদিন, বিছানায় পড়া মা, বিয়ের যোগ্য ছোট বোন ডালিয়া, বিয়ে না দিতে পারা রাবেয়া আপা, নিজের পড়াশুনা সব মিলিয়ে খোকা আর খোকা নেই পুরো পরিবারটি সারাক্ষণ ঘুরপাক করে তার মাথায়। মাঝে মাঝে রসু ভাবে এটাই কী জীবন, এই ছিলো তাদের ভাগ্যে। রাবেয়া আর রসু কান্নার সঙ্গি হয়েছে বহুবার।

রহমত মিয়া এ কষ্ট নিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। রাবেয়া একটা স্কুলে বাচ্চাদের পড়িয়ে মধ্যবয়স অতিক্রম করে চলেছে। সে আর অপমানিত হয়নি। সে প্রতিজ্ঞা করেছিলো কারো সামনে পাত্রী দেখা নামে পণ্য হবেনা আর কখনো। ছোট বাচ্চাদের পড়িয়েই জীবন কেটে যাবে, যাচ্ছে ভালোই। একটু ভেবে দেখলে কী অদ্ভুত লাগে, যেই ছেলেটা হাসি ঠাট্টা করে আজ মেয়ে(পাত্রী) দেখছে আর প্রত্যাখ্যান করছে সেই ছেলেটায় একদিন বাবা হবে। এমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয় রহমত মিয়ার মত একদিন তাকেও তার মেয়েকে বলতে হবে- কই মা চল, সবাই বসে আছে, দেড়ি হয়ে যাচ্ছে যে! সময় মানুষকে সব ফিরিয়ে দেয়। পই পই হিসাব করে ফিরিয়ে দেয়। এক জন্ম থেকে অন্য জন্মে না হয় পরজন্মে।

দিন একদিন পালটে যায়, অর্থকড়ি টাকা-পয়সা
সুখ স্বাচ্ছন্দ্য সবই আসে শুধু থাকে না প্রিয়জন প্রিয় মানুষ, রয়ে যায় কষ্ট গুলো।

ডালিয়া বিএসসি শেষ করে সোনালি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হয়েছে। রবিনের সাথে ভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় তাদের পরিচয়। রসু তাদেরকে বিয়ে দিয়েছে। রবিন বিসিএস দিয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদান করেছে।

রসু ব্যবসা করে মোটামুটি সমাজের একজন। ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সে। জীবন ঘুরে দাঁড়িয়েছে বদলে গেছে সব শুধু থেকে গেছে মনের কোণে জমানো কষ্টটুকু।

ছেলেমেয়েদের চিন্তায় চিন্তায় যাদের রাতের ঘুম বিসর্জন হয়েছে তাদের কেউ আজ বেঁচে রইল না। রসুর কষ্টটা এখানেই বাবা-মা কেউ দেখে যেতে পারলো না তাদের সুখ।
এটাই জীবন, এটাই পৃথিবী, এভাবেই চক্রাকারে চলবে অনন্তকাল।

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ

MD hedaetul Islam - (Sirajganj)
প্রকাশ ২৭/০২/২০২২ ০৪:৫৫পি এম
MD hedaetul Islam - (Sirajganj)
প্রকাশ ০১/০৩/২০২২ ০৪:৪৩পি এম