সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১
Motior Rahman Sumon - (Mymensingh)
প্রকাশ ২২/১১/২০২১ ০৪:৩৪পি এম

মনীষী মীর আব্দুল মতিন- এম. আর. সুমন

মনীষী মীর আব্দুল মতিন- এম. আর. সুমন
অধ্যবসায় বলে যে কয়জন বাঙালী মনীষী সমাজ ও স্বধর্মের সেবা করে গেছেন তাদের মধ্যে মীর আব্দুল মতিন অন্যতম।

তিনি ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার অন্তর্গত ঘাগড়া গ্রামে বাংলা ১৩০৪ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মীর হাসান আলী সম্ভ্রান্ত বংশের লোক ছিলেন। তিনি গফরগাঁও ইসলামিয়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় হতে ১৯১৮ সনে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি উক্ত বিদ্যালয়ে এক বৎসর শিক্ষাকতা করে ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। ১৯২০ সালে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে তিনি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে আন্দোলনে যোগদান করেন। ওয়েলিংটন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস ও খেলাফত কনফারেন্সে জনাব ফজলুল হক সেলবর্শী ও মাওলানা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে যোগ সূত্র স্থাপিত হয়। ১৯২১ সালে মীর সাহেব ময়মনসিংহ জেলা খেলাফত কমিটির প্রধান হিসেবে খেলাফত কমিটি গঠন করেন।
১৯২২ সালে উত্তর বঙ্গে বন্যার রিলিফ কার্য করার জন্যে মুসলিম রিলিফ মিশন নামে একটি সাহায্য সমিতি গঠন করেন। শেরে বাংলা ফজলুল হক উক্ত সমিতির সভাপতি ছিলেন। মির্জাপুর, ভবানীপুর, খঞ্জনপুর, আস্রাই প্রভৃতি স্থানে তাঁর আশ্রয় শিবির ছিল।

তিনি দরিদ্রের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্যে ঝাপিয়ে পড়তেন। দরিদ্রদের জন্যে বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ করার লক্ষ্যে চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়ন করতে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯২৩ সালে রাজনৈতিক কারণে ময়মনসিংহ লিটন মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে তিনি ময়মনসিংহ এস কে হাসপাতাল থেকে কম্পাউন্ডারি পাশ করেন। পরে কলকাতা থেকে হোমিওপ্যাথী এম বি পাশ করেন এবং মছীহুর রহমান সাহেবের ইউনানি কলেজে ইউনানি চিকিৎসা বিদ্যা শুরু করেন। দেবেন্দ্র সেন কবিরাজের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রাইভেট স্কুলে এলোপ্যাথি চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন।

১৯২৭ সনে গারো পাহাড়ের পাদদেশে মুন্সীর হাটে মীর আব্দুল মতিন সাহেব ইসলাম মিশন স্থাপন করেন এবং একটি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করেন। গারোদের মাঝে ইসলাম ধর্ম প্রচারের ফলে বহু গারো ও পাহাড়িয়ারা দলে দলে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করতে থাকে। গারোদের অবস্থা লক্ষ্য করে পাদ্রী মিশনারিরা বিরোধিতা আরম্ভ করেন এবং বৃটিশ সরকার ইসলাম মিশনটি বন্ধ করে দেন।

১৯৩৬ সালে আসাম বেঙ্গল কোরআন প্রচার সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ময়মনসিংহ জেলা কোরআন প্রচার সমিতির পঞ্চবার্ষিক রিপোর্ট মতে জানা যায়, ১৯৩৬ সালের নভেম্বর মাসে গফরগাঁও এ সর্বপ্রথম কোরআন প্রচার সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৭ সালে কোরআন প্রচারের উদ্দেশ্যে ও কর্মপন্থা আলোচনার জন্যে ৭৮টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ৫০ জন ভলান্টিয়ারের সাহায্যে ব্যাপক প্রচারণা, মসজিদ, ইমাম ও মুসল্লিদের তালিকা সংগৃহীত হয় এবং মসজিদে হাজিরা বহিঃ দেওয়া হয়। ইমামদের ট্রেনিং এর জন্যে মাদ্রাসা খোলা হয়। এক বছরের মধ্যে মুসুল্লির সংখ্যা ৯ হাজার থেকে ১৯ হাজারে উন্নীত হয়। পৌনে তিনশত ইমামের মধ্যে ১৭১ জন ইমামকে ট্রেনিং ক্লাসে ভর্তি করা হয়। ট্রেনিং বোর্ডের পরিচালনায় সমগ্র বাংলাদেশের মুসলমানকে নবজাগরণ হিল্লোলে জাগিয়ে তুলেছিলেন। 'কোরআনের বাণীই ইহলোক ও পরলোকের পারত্রিক ও আধ্যাত্মিক মুক্তির সন্ধান দিতে সক্ষম' ইহা প্রচারণাই ছিল কোরআন প্রচার সমিতির উদ্দেশ্য। 'মসজিদ ও জামাত' নামক একটি অতি মূল্যবান পুস্তক প্রণয়ন করেন। পুস্তকখানি ইমামগণের গাইট বুক রূপে ব্যবহৃত হত।

১৯৩৮ সালে ১৮ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ময়মনসিংহ জেলার প্রত্যেক থানায় থানায় পদব্রজে ভ্রমণ করেন এবং সমাজ সংগঠনমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাজকে উৎসাহ ও প্রেরণা দেওয়ার জন্য জনসভা করেন। 'দীপ্তি এবং আল-ইমাম' নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। 'পল্লীবার্তা' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশ করেন। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত মীর আব্দুল মতীন সাহেবের সম্পাদনায় পত্রিকা দুটি পরিচালিত ছিল।

জ্ঞান চর্চার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় আগ্রহ ছিল। ৬৫ বৎসর বয়সে ১৯৫৮ সনে নাসিরাবাদ কলেজের নৈশ ক্লাসে ভর্তি হয়ে আই. এ. ও বি. এ. ডিগ্রি লাভ করেন এবং সিদ্ধেশ্বরী বালিকা হাই স্কুলে ইসলামিয়াতে অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এবং সে বৎসরেই প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে এম. এ. পাশ করেন। স্বগ্রামে নারী শিক্ষা প্রসারের জন্যে একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং জনসাধারণের সুবিধার জন্য একটি ডাকঘর স্থাপন করেন।

মীর আব্দুল মতিন আরবি, ইংরেজি, ফার্সি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় বিশেষ পারদর্শী সুপণ্ডিত ছিলেন। 'দেওয়ান-ই-হাফেজ' মাওলানা রুমীর কিতাবসমূহের অনুবাদও করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন কবি। তাঁর বহু কবিতা পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

মীর আব্দুল মতিন সাহেব বীরখারুয়া গ্রামের মাওলানা নাজিম উদ্দিন আখতার সাহেবের সাথে হযরত মাওলানা আজান গাছী রহঃ এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং ধর্মপ্রচারে হাক্কানী আঞ্জুমানের মতবাদ প্রচারে ব্রতী হন। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি হাক্কানী আঞ্জুমান কায়েমের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। তিনি তিন মাইল দূরবর্তী বীরখারুয়া গ্রামের আঞ্জুমানে নিয়মিত ভাবে যোগদান করতেন। পরে তিনি স্বগ্রামে হাক্কানী আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই আঞ্জুমান তাঁর সুযোগ্য পুত্র মীর ফারুক সাহেব কায়েম রেখেছিলেন, বর্তমানেও চালু আছে বলে জানান মীর আব্দুল মতিন সাহেবের ভাতিজা মীর মোশাররফ। ঘাগড়া গ্রামে নিয়মিত বার্ষিক মজলিশ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
ইসলামের খেদমতে তিনি তাঁর জীবনের উপার্জিত সম্পত্তি দান করে গিয়েছেন এমনকি পিতৃপ্রদত্ত সম্পত্তিও কোরআন প্রচার ও হাক্কানী আঞ্জুমানের জন্য ব্যয় করে দিয়েছিলেন।

মীর আব্দুল মতিন সাহব ১৯৭২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইহকাল ত্যাগ করেন। মীর আব্দুল মতিন সাহেবের চার ছেলে, দুই মেয়ে। বড় ছেলে মীর আব্দুল ফারুক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ফারুক সাহেবের ছেলে বিমান পাইলট লন্ডন-ডোবাই-এ থাকেন।
২য় ছেলে মীর আব্দুল খালেদ । ৩য় ছেলে মীর আব্দুল জাফর অর্থপেডিস্কের নামকরা ডাক্তার ছিলেন, ৪র্থ ছেলে মীর আব্দুল বাকের বিভাগিয় নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। মীর সাহেবের ছয় ছেলে-মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে ছাড়া সবাই ইহলোক ত্যাগ করেছেন। মীর আব্দুল মতিন সাহেবসহ সকলের রূহের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত সংবাদ