H M Yeasin Arafat( - (Narsingdi))
প্রকাশ ১২/১১/২০২১ ০৬:১৭এ এম
জানো হুমায়রা, তোমাকে আমি যেদিন থেকে কাছে পেয়েছি সে দিন থেকে মনে হয় আমার সকল ভালোবাসা পূর্ণতা পেয়েছে।
আমি ছিলাম ভালোবাসার কাঙ্গাল, একটি পবিত্র ভালোবাসার জন্য হাহাকার করছিলো আমার হৃৎপিন্ড। সকল আবেগ, উচ্ছ্বাস, ভালো লাগা আর ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছিলাম তোমায় দিবো বলে। এই ভালোবাসা কোন দিন শেষ হবার নয়। শয়নে, স্বপনে, হৃদয়ে, মননে আজকের এই দিন টার অপেক্ষায় ই ছিলাম।

এভাবে এক শ্বাসে এত্ত গুলো কথা বলে থামলো রিহান। রাত তখন ১১ টার কাটা ছুঁই ছুঁই। খোলা আকাশের নীচে চাঁদের জ্যোৎস্নায় রিহান আর হুমায়রা পাশাপাশি, কাছাকাছি বসে আলাপ করছিলো।

তাদের বিয়ে হয়েছে এক মাস পেরিয়ে দুই মাসে পরেছে। বিয়ে হয়েছে পারিবারিক ভাবেই।
হুমায়রা ইন্টার শেষ করে সবে মাত্র অনার্সে উঠেছে ঠিক তখনি বিয়ে টা হয়ে গেলো। আর রিহান মার্কেটিং এর উপর মাস্টার্স কমপ্লিট করে বাবার বিসনেস টা দেখভাল শুরু করেছে।

আচ্ছা রিহান, তুমি কভু আমায় কষ্ট দিবা নাতো? বল্লো হুমায়রা।
নাহহহ, হতেই পারে না। আমার এই পরীর মত লাল টুকটুকে বউ টাকে তো ভালোবেসেই শেষ করতে পারবো না আবার কষ্ট দিবো কখন, বল্লো রিহান।
জীবনের ক্রান্তিলগ্নে যখন জীবন আয়ু ফুরিয়ে যাবে যখন চামড়া গুলো সব থুবড়ে যাবে তখনও তোমাকে ঠিক এখনের মতই ভালোবেসে যাবো। কখনো পূরনো হতে দিবো না আমাদের পবিত্র ভালোবাসাকে।
সুন্দর একটি সময়ের অপেক্ষায় কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। তবে আমি স্বার্থক, দিন শেষে তোমার মত একটা ভাগ্যবতী আর রূপসী মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসাবে পেয়ে।
হমম, হইছে থাক, আর বলতে হবে না হুমায়রা একটু দুষ্টামি করেই বল্লো।

চলো অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমুতে যাবে, কেনো সময় টা ভালো লাগছে না বুঝি? রিহান প্রশ্ন করলো।
ভালো তো লাগছেই কিন্তু সারা রাত এভাবে পার করে দিলে কাল অফিসে যেয়ে কাজ রেখে ঝিমুতে হবে। আর কিছুক্ষণ থাকি না।

আচ্ছা তো এই আলোকময় রাতে চাঁদের আলোতে আমাকে একটা কবিতা শুনাতে হবে,
ওমা কি বলো,,?
হমমম কোন মাফ নেই শুনাতেই হবে।
কাল শুনাই?
না আজ ই এবং ঘুমুতে যাবার আগে।
রিহান মনে মনে ভাবছে, এতো দিন একা একা কবিতা আবৃত্তি করতাম কিন্তু এখন থেকে সেটার অভাব ঘুচবে।
আচ্ছা, যেহেতু ফাঁকি দেয়ার কোন সুযোগ নেই তাহলে শুনো বলছি,,,,,,,

"ঐ সাগরের প্রতিটি তরঙ্গে
তোমায় খুঁজে পাই,
তোমার ঐ চুঁলের গাঁথুনিতে
নিজেকে হারাই।

গোলাপের ঐ দুটি পাপঁড়ির হাসিতে
সকল কষ্ট ভুলে যাই,
অজানা-অচেনা নিজেকে হারিয়ে
খুঁজে ফিরি নতুন এক আঙ্গিনায়।

রাগ-অভিমান আর ভালোসার
কড়িডোরে দাড়িয়ে,
আস্থা আর বিশ্বাসের হাত টা
দিয়েছো আমায় বাড়িয়ে।

শত শহস্র মানুষের ভিড়েও
খুঁজে পাই আমি তোমাকে,
জানি তুমি আগলে রাখবে
চিরদিন এই আমাকে।

ভূবন জুড়ে খুঁজেছি অনেক
পাইনি তোমার মত,
তোমাতেই মুঁগ্ধ আমি
আশা-ভরসা শত শত"।

বাহহহ চমৎকার বলেছো তো। সত্যিই আমি সারপ্রাইজড। তুমি এত্ত সুন্দর কবিতা লিখতে পারো জানা ছিলো না। ওগো আমি কিন্তু আবার নতুন করে তোমার ভালোবাসায় ডুবে গেলাম।
>হমম পাম দেয়া হচ্ছে না?
>নাহহ একটুও না।
>আচ্ছা আমাকে কবিতা লিখা শিখাতে পারো না?
>হমম কাল দোকান থেকে ক'টা কবিতা লিখতে শিখার টেবলেট কিনে খাইয়ে দিবো নে পরের দিন থেকে আমাকে নিয়ে কবিতা লিখবা কেমন...?
>ধুররর তুমি শুধু দুষ্টামি করো। চলো আজকের মত চাঁদ টাকে বিদায় দিয়ে রুমে গিয়ে শুয়ে পরি,,,,,,,

ভোরে প্রতিদিনের মত আজো উভয়ে উঠে উযু সেরে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে নিলো তারপর কিছুক্ষণ কোরান তিলাওয়াত করে ফজর নামাজ আদায় করে নিলো।
তারা যদিও জেনারেল লাইনে পড়েছে কিন্তু তাদের ভিতরে ছিলো ধার্মিকতা। ছিলো শরীয়তের সকল বিধিবিধানের প্রতি অঘাত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।

বউমা, এক কাপ চা দিও তো!
পাশের রুম থেকে আওয়াজ দিলেন খালেক সাহেব। তিনি হজ্ব করেছেন দাড়ি আছে মাঝে মধ্যে তাবলীগেও যান। বিসনেস টা বড় ছেলেকে দিয়ে তিনি এখন বাড়িতেই আছেন। রিহানের মা খাদিজা বেগম গৃহিণী। অনেক কষ্ট আর সুন্দর করে সংসার টা আগলে রেখেছেন।

তিন ভাইয়ের মাঝে রিহান সবার বড়। মেজো ছেলে রাফসান, এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে আর ছোট ছেলে রাব্বি মাদরাসায় পড়ে কোরানে হাফেজ। এবার কিতাব বিভাগে ভর্তি হবে।
দুই বোন। বড় বোন আনজুম ছোট বোন আফসানা। উভয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এই হলো খালেক সাহেবের পরিবার। সব মিলিয়ে বেশ ভালই চলছে।

রিহান সারা দিন অফিস করে ক্লান্ত আর অবসন্ন দেহ নিয়ে রাতে বাড়ি ফিরে। এদিকে হুমায়রা তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে কখন আসবে তার প্রাণের স্বামী। কিন্তু এই সময় টার ভিতরেও একে অপরকে কয়েকবার ফোন করে খোঁজ খবর নেয়।

>কিরে "হুমু" আমাদেরকে তো দেখছি একেবারেই ভুলে গেছিস! জিজ্ঞাস করলো রাইসা।
রাইসা তার সবচে কাছেন বান্ধবী। সেই ক্লাশ ৫ম থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত ছিলো এক সাথে। আর হুমায়রাকেই তার বান্ধবীরা "হুমু" বলে ডাকতো।
>নারে ভুলিনি। ফোন দিবো দিবো করেও দেয়া হয়নি।
>তো তোর বর টা কেমন আছে?
>আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো।
>তোর শশুর-শাশুড়ী সহ নতুন পরিবার আর পরিবেশ কেমন লাগছে তোর কাছে?
>তোদের দোয়ায় সব কিছুই মনের মত পেয়েছি রে। দোয়া করিস।
>অবশ্যই দোয়া করি।
>দেখছিস হুমু, কত তাড়াতাড়ি তুই আমাদের ছেড়ে চলি গেলি?
>কি করবো বল, এটাই তো বাস্তবতা। ইচ্ছে না থাকলেও কিছুই করার নেই।
>তো সনি, রানি, আমেনা, মারুফা সকলে কেমন আছে রে?
>সকলেই আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।
>আচ্ছা ভালো থাকিস আরেক দিন কথা হবে, আল্লাহ হাফেজ।
>আচ্ছা আল্লাহ হাফেজ।

আব্বা, আম্মা, দুপুরের খাবার টা খেয়ে নিন। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা বউমা খাবার টা টেবিলে রেখে যাও আসছি। খাবারের তাগাদা দিয়ে হুমায়রা চলে গেলো নিজ রুমে।
দুপুরের খাবার খেয়ে নিজ রুমে আরাম করছে হুমায়রা ঠিক এমন সময় রিহানের ফোন বেজে উঠলো। রিহান ফোন করে জানালো আজ বিকেলে আসর নামাজের পর প্রস্তুত থাকতে, দুজন মিলে নৌকা ভ্রমনে বের হবে। যেই কথা সেই কাজ।
ঠিক আসরের পর,,,,,,,,,,,


#পর্ব=২

বাড়িতে আসরের নামাজ পড়ে রিহান আর হুমায়রা বের হয়ে গেলো নৌকা ভ্রমনে।
>জানো রিহান, আমার অনেক দিনের সখ ছিলো নৌকা ভ্রমন করবো। আজ সেটা পূরণ হতে চলল তোমার হাত ধরে। সে জন্য তোমাকে অনেক অনেক থেংক্স।
>হমম হইছে থামো এবার, পাম দিতে হবে না।
শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে এসে একটা নৌকা ভাড়া নিলো ২/৩ ঘন্টার জন্য রিহান আর হুমায়রা। রোদ পশ্চিম আকাশে হেলে পরেছে গোঁধুলী সন্ধা, মায়াময় বিকেল, দখিনা হাওয়া আর চমৎকার পরিবেশ। আর নদীও তার আপন গতীতে অবিরাম বয়ে চলছে। মাঝিঁরা পাল তুলে নৌকা চালাচ্ছে। নদীর মাঝখানে একটা নৌকা আর তাতে মাঝিঁ আর ওরা দু'জন। হুমায়রা নৌকায় বসে বসে কাগজের নৌকা বানিয়ে পানিতে ছেড়ে দিচ্ছে আর রিহান মনের আনন্দে ছোট্ট করে নদী'কে নিয়ে একটা কবিতা ধরেছে।

"অবিরাম বয়ে চলে
কলকল তানে,
মন ভরে যায় প্রাণ ভরে যায়
নদীর গানে গানে।

ঢেউ'য়ের তালে মাঁঝি চলে
মুখে নিয়ে গান,
অপরুপ দৃশ্যে ভরা
মহান প্রভুর দান।

নদী যেয়ে মিশে যায়
সাগর মোহনায়,
এসব কিছুই হয় যে গিয়ে
প্রভুর করুনায়"।

আহহহ কি মধুর সময়,,। দুজনের মিষ্টি আলাপন আর রোমান্টিকতায় কখন যে সময় ফুরিয়ে গেলো তারা টের-ই পেলো না।
>এই যে ভাই, ভাবিরে নিয়া এবার নামেন আপনাদের সময় শেষ।
মাঝিঁর কথায় সম্মিত ফিরে পেলো রিহান। এতোক্ষন আনমনা হয়ে খোশগল্প চলছিলো। তাড়াতাড়ি যেতে হবে, বাড়ি গিয়ে মাগরিবের নামাজ টা পড়ে নিতে হবে।

>কিরে রিহান কোথায় গিয়েছিলি বাবা?
>এই তো বাবা তোমার বউমাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম।
>রাফসানের ফরম ফিলাপের টাকা দিয়েছিলি?
>না বাবা কাল বলো আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে।
>আচ্ছা

হঠাৎ হুমায়রার বাবার ফোন বেজে উঠলো।
>কিরে মা সেই কবে বাড়ি থেকে গেলি একটুও কি আসতে মন চায় না? আমাদেরকে তো দেখি ভুলেই গেছিস।
> না বাবা, উনি বিসনেস টা নিয়ে একটু ব্যস্ত তাই আসতে পারছি না। তবে আগামি সপ্তাহে আসবো ইনশাল্লাহ।
> তো বাবা, মা, মিম, মিদুল কেমন আছে ওরা সবাই?
(ওরা দুই বোন এক ভাই, হুমায়রা সবার বড়, মিম ক্লাশ এইটে দাখিল মাদরাসায় পড়ে আর মিদুল কেবল মাত্র ৪ বছর)
> সবাই ভালো আছে। নে তোর মা'র সাথে কথা বল।
>আসসালামু আলাইকুম মা কেমন আছো?
> ফোনে আর কত জিজ্ঞাস করবি? এবার দেখে যা না মা।
> আগামি সপ্তাহে আসবো মা দোয়া করো।
>আচ্ছা ভালো থাকিস।
এভাবেই চলতে থাকলো তাদের মিষ্টি সংসার টা,,,

>রিহান,,, রিহান,,,, রিহান,,,,
রাত তখন ঘড়ির কাটা দুইটার ঘর পেরিয়ে তিনটার ঘরে। হঠাৎ হুমায়রার চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে গেলো রিহানের।
>কি হয়েছে হুমায়রা? এমন করে চিৎকার করছো কেনো?
>আমাকে এক গ্লাস পানি দাও
>এই যে খেয়ে নাও
>কি বাজে স্বপ্ন দেখেছো নাকি?
>হমমম
>কি সেটা বলো তো শুনি
>বিয়ের আগে প্রায় ই এমন স্বপ্ন দেখতাম। তারপর হুমায়রা তার স্বপ্নের কথা বলতে শুরু করলো,,,,,

"এশার নামাজ পড়ে একটু বাহিরে গিয়েছি, হঠাৎ কে যেনো পিছন থেকে নাম ধরে ডাকলো। প্রথমে আমি শুনেও না শুনার ভান করেছি, কিন্তু দেখলাম আবার ডাকলো, এবার ফিরে তাকালাম। চেয়ে দেখি সাদা কাপড়ে মোড়ানো বিশাল লম্বা কি যেনো ঠাঁই দাড়িয়ে আছে। তবে তার পা মাটিতে নেই আর মুখ দিয়ে অঝোর ধারায় রক্ত পরে পুরো সাদা কাপড় টা ভিজে গেছে। মনে হচ্ছে সবে মাত্র কোন জীব-জন্তু খেয়ে আসছে"। তার পর ঘুম ভেঙ্গে গেলো আর অমনি চিৎকার করে উঠলাম। হুহহহ

>রিহান আমাকে তুমি তোমার বুকে জড়িয়ে নাও প্লিসস আমার প্রচন্ড ভয় হচ্ছে।
>ধুররর বোকা, কপালে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে বল্লো। তোমার কিচ্ছু হবে না। পাগলি। আমি আছি না। দুঃস্বপ্ন দেখেছো। নাও বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরো। অনেক রাত এখন,,,,,,।

>ভাইয়া, আমার কিতাব কিনতে হবে টাকা দাও, বল্লো রাব্বি।
>কত লাগবে?
>আট শত দিলেই হবে।
>নে এক হাজার নিয়ে যা। প্রয়োজনে খরচ করিস।
এদিকে মেজো ভাই রাফসানের পরিক্ষাও ঘনিয়ে এসেছে। সে খুবি পরিশ্রমী। বরাবর ই ভালো রেজাল্ট করে আসছে। তাই এবারও সকলে আশাবাদী ভালো একটা রোল্ট করবে।
এভাবেই কাটতে লাগলো তাদের সময় গুলো। দেখতে দেখতে তাদের ছয় মাস পেরিয়ে গেলো।

সকাল থেকে-ই একটানা ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। থামার কোন জো নেই। রিহান আজ অফিসে যাবে না। এই বৃষ্টিস্নাত দিন টি সে তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর সাথে কাটাতে চায়। অনেক দিন হলো হুমায়রাকে তার মত করে সময় দেয়া হয় না। হুমায়রা বেচারী ও কাজের চাপ দেখে রিহানকে জোর করে না। কি লক্ষী বউ। এমন বউ ক'জনার কপালে জুটে।

>আচ্ছা রিহান, চলো না আজ আমরা এক সাথে আজ বৃষ্টিতে ভিজি?
>আরে কি বলো! আব্বা আম্মা দেখলে কি বলবে বলো তো,,,
>আরে ধুররর, তারা দেখবে কেনো। ওই ঘর টার পিছনে যে ফাঁকা জায়গা টা ওখানে ভিজবো।
>ভিজলে তো ঠান্ডা জ্বর আসতে পারে
>আসুক। তবু তোমার সাথে ভিজবো।
>এতো দিন পর আবার তোমার বৃষ্টিতে ভিজার সখ হলো কেনো?
>পারলে তো প্রতিদিন ই ভিজতাম।
>হমমম হইছে। আচ্ছা চলো,,,,।

আজ ২৬শে জুন। ২৭শে জুন হুমায়রার জন্মদিন। তাই রিহান আগে থেকেই তার সব কিছু প্লান করে রেখেছে। কারন রাত ১২ টা বাজার সাথে সাথে ই তো তার প্রিয়তমাকে উইশ করতে হবে। রাতের খাবার সেরে উভয়ে বসে গল্প করছে। কারো চোখে ই কোন ঘুম নেই। রাত ১২ টা বাজার সাথে সাথে রিহান তার পকেট থেকে এক গুচ্ছ গোলাপ বের করে হাটু গেড়ে বসে হুমায়রাকে শুভেচ্ছা জানালো। সে খুবি খুশি হয়েছে। তারপর উভয়ে মিলে কেক কেটে জন্মদিন পালন করলো।
>এবার রিহান বল্লো, আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্মদিনে তোমার জন্য আরো একটা সারপ্রাইজ রয়েছে।
>কি সেটা?
>তোমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছি। আর সেটা এখন তোমাকেই উৎসর্গ করছি,,,,,

"জীবনের এক প্রান্তে দাড়িয়ে ডেকে
বলছি হে প্রিয় তুমি আমায়,
হৃদয়ের বাহুডোরে জড়িয়ে নাও
বেধে রাখো তোমার মনের আঙ্গিনায়।

দূর দুরান্তে, পথ প্রান্তে মায়াবি চাহনী
দিচ্ছে ডাক হচ্ছি বেহুশ হয়ে নাজেহাল,
তোমাতেই নিজেকে উজাড় করে
ভালোবেসে যাবো আমি অনন্তকাল।

ভেবো না তুমি, গিয়েছি দুরে চলে
হয়তো কখনো ফিরিবো না আর,
না না না, তুমি হীনা যাবো কোথা
আছি আর থাকবো পর্যন্ত পরপার।

শরীরের প্রতিটি শিরা'য় শিরা'য় তোমার
ভালোবাসা'কে করি'যে আমি লালন,
শত কষ্ট করে হলেও তোমার
প্রতিটি কথা করি'যে আমি পালন।

চাই নি কিছু-ই চেয়েছি শুধু তোমায়
এই পৃথিবীর তরে
মরে গিয়েও যেনো পেয়ে যাই তোমায়
মহান প্রভুর ওপারে।

হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা সকল
কিছু-ই আমার তোমাকে ঘিরে,
অনন্তকালের হাজারো যাতনা
দিও তুমি আমায় মুচন করে"।

সত্যিই তুমি অসাধারণ লিখেছো। তোমার মত একজন কবি'কে জীবন সাথী হিসাবে পেয়ে আমার ইহজীবন স্বার্থক আর পরোপারের অনন্ত জীবনেও শুধু তোমাকেই চাই।
এবার দু'জনে উযু করে "কিয়ামুল লাইল" দু'রাকাত করে নামাজ পড়ে শুয়ে পরলো। তারপর কি হয়েছে সেদিকে আমরা না যাই, ও গুলো সবার সামনে বলতে নেই। কারন তা স্বামী-স্ত্রীর ব্যপার😁😁😁

রাফসান ইন্টারের ফাইনাল পরিক্ষা শেষ করেছে প্রায় দু'মাস হতে চলল। ঘনিয়ে এসেছে তার রেজাল্টের সময়। শত প্রতিক্ষার পর বের হলো তার রেজাল্ট সীট,,,,,,,,


#পর্ব=৩

রেজাল্ট সীট হাতে নিয়ে রাফসান খুশিতে আটখানা। বরাবরের মত সে এবারও ভালো রেজাল্ট করেছে। অর্থাৎ সে এবারও A+ পেয়েছে। বাড়িতে এই সংবাদ পৌছাতেই সকলে প্রচন্ড খুশি। এবং মিষ্টি এনে পুরো এলাকা জুড়ে বিলিয়েছে।

>বউমা, তুমি রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। রান্নার কাজ টা আমিই করছি। বল্লো রিহানের মা।
>মা, আমি পারবো সমস্যা নেই।
>ধুররর বোকা, যাও তো গিয়ে শুয়ে থাকো।
দেখতে দেখতে হুমায়রা ৮/৯ মাসের গর্ভবতী হয়ে গেছে। এখন তার সব কিছুই দেখে শুনে চলতে হয়। প্রতিটি কাজে তার শাশুড়ি মা তাকে প্রচন্ড সহযোগীতা করে। কোন কাজ তাকে করতে দেয় না। এ কয়দিনে শশুর-শাশুড়ীকে সে খুবি আপন করে নিয়েছে। আর রিহানের মা-বাবাও হুমায়রার প্রতি অনেক খুশি।
যথাসময়ে তার শাশুড়িকে চুল আঁচড়ে দেয়া, তার শশুর-শাশুড়ী উভয়কে যথাসময়ে ঔষধ খাইয়ে দেয়া সহ তাদের সকল কাজ বেশ চমৎকার ভাবে সে আঞ্জাম দিয়েছে। তাই আজ সেও তাদের কাজ থেকে যথপোযুক্ত কেয়ার পাচ্ছে। প্রতিটি পরিবারের বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক গুলো এমনি হওয়া উচিত।

অফিস থেকে এসে রিহান ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিজ রুমে গিয়ে বসলো।
>আচ্ছা বাবু টা ছেলে হলে কি নাম রাখবা?
জিজ্ঞাস করলো হুমায়রা।
>ছেলে হলে 'আদিল' আর মেয়ে হলে নাম রাখবো 'আয়েশা' বল্লো রিহান।
>আর শুনো যেটা ই হোক অবশ্যই কিন্তু মাদরাসায় পড়াতে হবে--হুমায়রা।
>আচ্ছা মেডাম, তা না হয় পড়াবো সমস্যা নেই। এখন অনেক রাত হয়েছে চলো ঘুমাবে। কারন এখন তোমার কষ্ট মানে আমাদের আগত অতিথির কষ্ট--রিহান।
>অনেক দিন হলো তুমি আমাকে কবিতা শুনাও না। প্লিসস রিহান, আজ একটা কবিতা শুনাও,,, বল্লো হুমায়রা।
>কাল শুনালে হয় না?
>না এখনি শুনবো।
>তুমি না এখনো বাচ্চা ই রয়ে গেছো। যা বায়না ধরো সেটা আদায় করেই ছাড়ো। আচ্ছা শুনো,,,,,,

তোমার হাতে হাত রেখে আমি
দুর অজানায় পারি জমাবো,
তোমার বুকে মাথা রেখে আমি
শান্তির ঘুম ঘুমাবো।

তোমার সুখে হাসিবো আমি
কাদিবো তোমার দুঃখে,
বিপদে আপদে পাশে থাকিব
ছেড়ে যাবো না রেখে।

তোমায় নিয়ে কবিতা লিখিবো
গাহিবো আমি গান,
জীবন মরণ আগলে রহিবো
যত আসুক ঝড়তুফান।

তোমায় নিয়ে মজিবো আমি
থাকিবে না আর পিছুটান,
হৃদ মাজারে রাখিবো তোমায়
মন হবে না আর আনচান।

সুখি সংসার গড়িবো মোরা
রহিবে না কোন ব্যাথ-বেদনা
সত্যি বলছি ভালো রাখিবো
দিবো না কভু তোমায় যাতনা।

>জানো রিহান, তোমার প্রতিটি কবিতা আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রতিটি শব্দ যেনো আমার কর্ণকুহরে বার বার প্রতিধ্বনি হয়।
>হুমায়রা--ওগো শুনো?
>রিহান--কি?
>হুমায়রা---একটা কথা বলি?
>রিহান---একটা কেনো হাজার টা বলো।
>হুমায়রা--(💜💙I Love You💛💜)
>রিহান---হমম আজ ভালোবাসা বেড়ে গেছে বুঝি?
>হুমায়রা--হম শুধু আজ নয় প্রতিদিন, প্রতি ক্ষন, প্রতিটি সময় তোমাকে এভাবেই ভালোবেসে যাবো।
>রিহান--আচ্ছা মেডাম এবার চলেন তাহলে ঘুমুতে যাই।
এই বলে তারা উভয়ে নতুন একটি সুন্দর স্বপ্নের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়লো।

রাফসান একটা ভার্সিটিতে মার্কেটিং এর উপর অনার্সে ভর্তি হয়ে গেছে। সাথে পড়া লেখাও বেশ ভালই চলছে। রাব্বি তাইসির জামাত শেষ করে মিজান জামাতে ভর্তি হয়ে গেলো। সেও তাইসিরে বেফাক বোর্ডে 'মমতাজ' মার্ক পেয়েছে। মাদরাসার সকল উস্তাদরা তাকে বড্ড মোহাব্বত করে।

হুমায়রার কোল জুড়ে ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নাম রাখা হলো 'আয়েশা' মেয়ে সন্তান হওয়াতে সবচে বেশি খুশি হয়েছে রিহান। সে মেয়ে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা-ই করতো। কারন সে জানতো, পরিবারে প্রথম কন্যা সন্তান হলে আল্লাহ তায়ার পক্ষ থেকে ওই পরিবারের উপর রহমতের দরজা খুলে যায়। অল্প দিনেই বেশ বড় হয়ে গেলো। যখন তার ৪ বছর পেরিয়ে গেলো তখন তার মা তাকে মক্তবে পাঠাতে লাগলো। বাড়িতেও হুমায়রা তাকে যতটুকু সম্ভব শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করে।

এরি মাঝে জনাব খালেক সাহেব দুনিয়া ছেড়ে পারি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। হঠাৎ হার্টফিল করে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। পরিবারের সকলেই শোকে মুহ্যমান। তবু তো কিছুই করার নেই। সবি উপরওয়ালার ইচ্ছে।

রাফসান মাস্টার্স শেষ করে একটা কম্পানীতে চাকুরি পেয়েছে। এক ধনীর দুলালি বিয়ে করেছে। নাম 'আনিকা' কিন্তু সে তার শাশুড়িকে হুমায়রার মত কেয়ার করে না। যখন যা খুশি তাই করে। রাফসান জোড় গলায় কিছু বলতেও পারে না। এভাবেই কোন রকম চলছে তাদের সংসার। আর রাব্বি দাওরা (আরবিতে মাস্টর্স) শেষ করে একটা বড় মসজিদে খেদমত পেয়েছে। ভালোই চলছে তার দিনকালও।

আয়েশা মাদরাসা থেকে ক্লাশ ৫ম-এ পরিক্ষা দিয়ে বৃত্তি পেয়েছে। সে জন্য সে তার আব্বার কাছে বায়না ধরেছে যে, দূরে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। সে তার লক্ষী মেয়ের আবদার নাকচ করতে পারেনি। তাই সিদ্ধান্ত নিলো আসছে ডিসেম্বরের ১২ তারিখ রবিবার তারা স্বপরিবারে ৪ দিনের জন্য কক্সবাজার ঘুরতে যাবে। সাথে রিহানের আম্মাও যাবে।এটা শুনে হুমায়রা বেশ খুশি হয়েছে। বিবাহের পর তাকে নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায়নি রিহান। তবে প্রায় সময় রিক্সা বা নৌকা যোগে ঘুরতে বেরিয়েছে। আয়েশা হবার আগ পর্যন্ত তাদের সময় গুলো বেশ চমৎকার কেটেছে। এরপর মেয়েকে দেখাশোনা আর রিহানের বিসনেস টার জন্য আর তেমন সময় হয়ে উঠেনি।

যেই কথা সেই কাজ। রিহান তাদের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করে রেখেছে। শুক্রবার থেকেই মা মেয়ের প্রস্তুতি শুরু। কারন শনিবার রাত ১০ টার দিকে তারা গাড়িতে উঠবে।
শনিবার ঠিক সময়ে ই তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। সেখানে গিয়ে সকলে বেশ সুন্দর ভাবেই সকল জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখলো। এবং ভালো করেই কাটালো দিন গুলো। এবার ফেরার পালা।

বুধবার রাতে সকলে গাড়িতে উঠেছে বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, রাত প্রায় ২/৩ টার দিকে হঠাৎ আচমকা কোন এক ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগে ছিটকে পরলো ড্রাইবার সহ তারা ৫ জন পাঁচ দিকে।
সাধে সাথে ঘটনাস্থলে ড্রাইবার, রিহানের মা আর রিহানের প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হুমায়রা মৃত্যুবরণ করে। আর আয়েশা আর রিহানকে অজ্ঞান অবস্থায় পেলেও ২ দিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করেও বাঁচতে পারেনি। রিহান আর আয়েশাও হুমায়রা আর তার আম্মার পথ ধরেছে। একটি আনন্দঘন ভ্রমন নিভিয়ে দিলো ৫ টি তাজা প্রাণ। চরম এক বাস্তবতার কাছে পরাজিত হলো তাদের সুখি সংসার। পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে হারিয়ে গেলো আরো একটি আদর্শ পরিবার। ফুটবার আগেই ঝড়ে গেলো গোলাপের পাপড়ি গুলো। তারা সকলেই ভালো থাকুক ওপারে। (আল্লাহ হাফেজ)

{গল্পটি সমাপ্ত হলো}

(বি.দ্র. গল্প টি পড়ে কেমন লাগলো? প্লিসস কমেন্ট করে অনুভূতি টা ব্যক্ত করে যাবেন, কৃতার্থ হবো এবং লিখনী শক্তিতে আরো আত্নবিশ্বাস ফিরে পাবো)

শেয়ার করুন

ad image

সম্পর্কিত সংবাদ